এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় রচিত ‘দূরবীন’ উপন্যাসের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘দূরবীন’ বাংলা কথাসাহিত্যের এক বিস্তৃত জীবনাখ্যান, যেখানে তিন প্রজন্মের ব্যক্তিগত জীবন, প্রেম, আদর্শ, রাজনৈতিক উত্থান-পতন এবং পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে ধরা পড়েছে একটি দীর্ঘ সময়ের সামাজিক ও ঐতিহাসিক বিবর্তন। বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকের শেষভাগ থেকে আশির দশক পর্যন্ত বিস্তৃত এই উপন্যাসে লেখক কেবল কয়েকটি মানুষের জীবনকাহিনি বলেননি; তাঁদের অভিজ্ঞতা ও পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন বদলে যাওয়া বাংলার সমাজ, মূল্যবোধ ও জীবনবোধের ছবি। স্বদেশি আন্দোলন, দেশভাগ এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন এই আখ্যানকে দিয়েছে বৃহত্তর ঐতিহাসিক তাৎপর্য।
উপন্যাসটির কেন্দ্রে রয়েছে তিন প্রজন্মের তিনটি স্বতন্ত্র জীবন—হেমকান্ত, কৃষ্ণকান্ত ও ধ্রুব। তাঁদের প্রত্যেকের জীবনদর্শন, মানসিক গঠন ও সম্পর্কের ধরন আলাদা। অথচ তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত যে একজনের জীবনকে অন্যজনের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। তাঁদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস, ভালোবাসা, ব্যর্থতা ও দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের জীবনযাপনের ধরন বদলে গেলেও কিছু আবেগ, আকাঙ্ক্ষা ও সম্পর্কের সংকট প্রজন্মের পর প্রজন্মে নতুন রূপে ফিরে আসে।
প্রথম প্রজন্মের প্রতিনিধি হেমকান্ত চৌধুরী একজন জমিদার। তাঁর ব্যক্তিত্বে রয়েছে আভিজাত্য, অন্তর্মুখিতা ও একধরনের নিঃসঙ্গতা। রঙ্গময়ীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক উপন্যাসের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক। রঙ্গময়ী পুরোহিতকন্যা হলেও ব্যক্তিত্বে দৃঢ় এবং মানসিক শক্তিতে স্বতন্ত্র। তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে প্রেমের পাশাপাশি রয়েছে সামাজিক অবস্থান, ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ও আত্মিক টানাপোড়েনের জটিলতা। হেমকান্তের জীবনের মধ্য দিয়ে লেখক এমন এক সময়কে তুলে ধরেছেন, যখন জমিদারি ব্যবস্থা ও তার সঙ্গে যুক্ত সামাজিক মূল্যবোধ ক্রমশ পরিবর্তনের মুখোমুখি হচ্ছিল।
দ্বিতীয় প্রজন্মের কৃষ্ণকান্ত হেমকান্তের পুত্র। তাঁর জীবনে আদর্শ, আত্মসংযম ও দেশপ্রেম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্বদেশি আন্দোলনের আবহে গড়ে ওঠা কৃষ্ণকান্তের জীবন পরবর্তীকালে স্বাধীন ভারতের রাজনীতি ও ক্ষমতার পরিসরে প্রবেশ করে। তাঁর ব্যক্তিত্বে যেমন আদর্শনিষ্ঠার পরিচয় রয়েছে, তেমনই সময় ও পরিস্থিতির সঙ্গে তাঁর অবস্থানের পরিবর্তনও উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। হেমকান্তের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের মধ্যে যে স্নেহ ও ভালোবাসা কাজ করে, ধ্রুবর সঙ্গে কৃষ্ণকান্তের সম্পর্ক তারই এক বিপরীত প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি ধ্রুব। তার জীবন, মানসিকতা ও সম্পর্কের জটিলতা উপন্যাসে নতুন মাত্রা যোগ করে। কৃষ্ণকান্তের সঙ্গে তার দূরত্ব কেবল পিতা-পুত্রের ব্যক্তিগত বিরোধ নয়; এর মধ্যে রয়েছে মূল্যবোধের সংঘাত, প্রজন্মগত ব্যবধান এবং অতীতের উত্তরাধিকার গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের প্রশ্ন। ধ্রুবর প্রেমের সম্পর্কেও তার মানসিক অস্থিরতা ও ব্যক্তিত্বের নানা দিক প্রকাশ পায়। রেমির সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালোবাসা, উপেক্ষা, বিরাগ ও আবেগের জটিল টানাপোড়েনে গড়ে ওঠে। ধ্রুবকে নিছক নায়কোচিত আদর্শের প্রতিমূর্তি হিসেবে নির্মাণ না করে লেখক তার দুর্বলতা, অসংগতি ও অন্তর্দ্বন্দ্বকেও সামনে এনেছেন।
‘দূরবীন’-এর অন্যতম শক্তি হলো এর চরিত্রনির্মাণ। এখানে কোনো একটি চরিত্রের জীবন বিচ্ছিন্নভাবে বিকশিত হয় না; প্রত্যেকের ব্যক্তিগত কাহিনি বৃহত্তর সামাজিক ও পারিবারিক আখ্যানের সঙ্গে যুক্ত। প্রধান চরিত্রগুলির পাশাপাশি পার্শ্বচরিত্রগুলিও উপন্যাসের জগৎকে বহুমাত্রিক করে তুলেছে। তাদের সুখ-দুঃখ, আকাঙ্ক্ষা, দ্বন্দ্ব ও সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সমাজের নানা স্তর ও মানুষের বিচিত্র মনস্তত্ত্ব প্রকাশিত হয়েছে। লেখকের পর্যবেক্ষণশক্তি ও মানবচরিত্রের অন্তর্গত জটিলতা অনুধাবনের ক্ষমতা এই বিশাল আখ্যানকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
উপন্যাসটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য এর ইতিহাসচেতনা। স্বদেশি আন্দোলন, দেশভাগ এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন এখানে নিছক পটভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি; বরং এই ঘটনাগুলি চরিত্রগুলির জীবন, বিশ্বাস ও সম্পর্ককে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করেছে। একদিকে পুরোনো জমিদারি সমাজের অবক্ষয়, অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী আদর্শের উত্থান এবং পরবর্তীকালে রাজনীতির ক্ষমতাকেন্দ্রিক বাস্তবতা—এই পরিবর্তনগুলির মধ্য দিয়ে উপন্যাসে একটি সমাজের রূপান্তর ধরা পড়েছে। ব্যক্তিজীবন ও ইতিহাসের এই পারস্পরিক সম্পর্ক ‘দূরবীন’-কে নিছক পারিবারিক উপন্যাসের সীমা অতিক্রম করতে সাহায্য করেছে।
‘দূরবীন’ নামটির মধ্যেও নিহিত রয়েছে উপন্যাসটির অন্তর্নিহিত দৃষ্টিভঙ্গি। দূরবীন দিয়ে দূরের বস্তুকে কাছে দেখা যায়, আবার তার বিপরীত ব্যবহার দূরের ও কাছের মধ্যকার আপাত সম্পর্ককেও বদলে দিতে পারে। উপন্যাসের তিন প্রজন্মের জীবনকে পাশাপাশি রাখলে একই ব্যক্তি, সম্পর্ক ও ঘটনাকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ তৈরি হয়। হেমকান্তের কাছে কৃষ্ণকান্ত যে অর্থ বহন করে, কৃষ্ণকান্তের কাছে ধ্রুব সেই একই অর্থ বহন করে না। এক প্রজন্মের ভালোবাসা অন্য প্রজন্মের কাছে কখনও প্রত্যাশার বোঝা, কখনও বিরোধের কারণ, আবার কখনও অধরা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে। অতীত ও বর্তমানের এই দ্বৈত দৃষ্টিই উপন্যাসটির নামকরণকে গভীর তাৎপর্য দিয়েছে।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের আখ্যানরীতিতে অতীত ও বর্তমানের সমান্তরাল উপস্থিতি উপন্যাসটিকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। কাহিনি বিস্তৃত, চরিত্রের সংখ্যা অনেক এবং ঘটনাপ্রবাহ দীর্ঘ সময় জুড়ে প্রসারিত। ফলে উপন্যাসটি পড়তে ধৈর্য ও মনোযোগের প্রয়োজন হয়। কোথাও কোথাও কাহিনির বিস্তার পাঠকের কাছে ধীরগতির বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এই বিস্তারের মধ্য দিয়েই লেখক চরিত্রগুলির জীবনের নানা স্তর উন্মোচন করেন এবং ব্যক্তিগত ঘটনাকে বৃহত্তর সময়ের সঙ্গে সংযুক্ত করেন। উপন্যাসটির মূল্যায়নে তাই শুধু কাহিনির গতি নয়, এর সামাজিক ব্যাপ্তি, চরিত্রের মনস্তত্ত্ব ও সময়কে ধারণ করার ক্ষমতাকেও বিবেচনা করতে হয়।
সব মিলিয়ে, ‘দূরবীন’ তিন প্রজন্মের জীবনকে কেন্দ্র করে রচিত হলেও এর পরিসর বহুগুণ বিস্তৃত। এটি পিতা-পুত্রের সম্পর্কের উপন্যাস, প্রেম ও বিচ্ছেদের উপন্যাস, আদর্শ ও বাস্তবতার সংঘাতের উপন্যাস; একই সঙ্গে একটি পরিবর্তনশীল সমাজের ইতিহাসও। হেমকান্ত, কৃষ্ণকান্ত ও ধ্রুবের জীবন পরস্পরের প্রতিবিম্ব হয়ে ওঠে, আবার প্রত্যেকেই নিজের সময় ও স্বভাবের কারণে স্বতন্ত্র। তাঁদের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় দেখিয়েছেন, উত্তরাধিকার কেবল সম্পত্তি বা সামাজিক মর্যাদার বিষয় নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মূল্যবোধ, স্মৃতি, প্রত্যাশা, ক্ষোভ ও ভালোবাসার জটিল বোঝাপড়া। এই বহুমাত্রিক জীবনদৃষ্টি, ইতিহাসের সঙ্গে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সংযোগ এবং মানবমনের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের কারণেই ‘দূরবীন’ বাংলা কথাসাহিত্যের একটি স্মরণীয় সৃষ্টি।