ইসলাম দর্পণ

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

ঈশ্বরের পরিচয় ও গুণ

সৈয়দ আবদুল আগফর

ঈশ্বর নিরাকার চৈতন্য স্বরূপ। তিনি সর্ব্বত্র বিদ্যমান, কেহ তাঁহাকে দেখিতে পায় না। তিনি সকলকে দেখেন। তিনি আকাশ মর্ত্ত্য, পাতাল, চন্দ্র, সূর্য্য, গ্রহ, নক্ষত্র, মনুষ্য, পশু, পক্ষী, চেতন, অচেতন সমুদয় পদার্থ সৃষ্টি করিয়াছেন। তিনি অদ্বিতীয় অপরূপ, অতুলনীয়; তিনি একমাত্র পূজনীয়। তিনি ভিন্ন আর কিছু পূজনীয় নাই, তিনি সৃষ্টিকর্ত্তা, সংহারকর্ত্তা, রক্ষাকর্ত্তা ও পালনকর্ত্তা; তাহার নিকট মানবগণ পাপ পুণ্যের জন্য দায়ী। তিনি মৃত ব্যক্তিদিগকে পরকালে পুনর্জ্জীবিত করিয়া পুণ্যাত্মাদিগকে স্বর্গবাসী ও পাপীদিগকে নরকস্থ করিবেন। তিনি শান্তিদাতা, আহারদাতা, সর্ব্বশক্তিমান্, পতিতপাবন, বিপদ-নাশন, বিপদ-তারণ; তাহার আদেশ ব্যতীত কোন কাৰ্য্য হইতে পারে না। এমন কি, একটা বালুকা কণাও স্থানান্তরিত হইতে পারে না। তিনি লোকের অদৃষ্টলিপির লেখক, তিনি যাহা ইচ্ছা করেন, তাহাই হয়। তিনি ইচ্ছা করিলে, মুহূর্ত্ত মধ্যে চন্দ্র, সূর্য্য, গ্রহ, নক্ষত্র ও পৃথিবী ইত্যাদি সমুদয় পদার্থের ধ্বংস সাধন করিতে পারেন। ঐরূপ মুহূর্ত্ত মধ্যে পত্তন করিতে পারেন। তিনি নিজ ক্ষমতার প্রবল প্রতাপান্বিত সম্রাটকে ভিক্ষুক করিতে পারেন এবং ভিক্ষুককে সম্রাট করিতে পারেন। তিনি মানবের অন্তরের সংবাদ রাখেন। তিনি পরম দয়ালু, দাতা; তাঁহার দয়া ব্যতীত মানবের মুক্তি নাই। তাঁহার দয়াই আমাদের একমাত্র ভরসা স্থল। তিনি কাহাকেও জন্ম দেন না, তিনি কেহ হইতে জন্ম গ্রহণ করেন নাই। তিনি পবিত্র, তিনি একমাত্র অহঙ্কারের যোগ্য। তাঁহার মৃত্যু নাই, তাঁহার জ্ঞাতি কুটুম্ব নাই, সকলই তাঁহার দাস। তিনি ভূত ভবিষ্যৎ সমুদয় জানেন। সুতরাং স্বীয় সৃষ্টিকর্ত্তার আরাধনা করা মানুষ মাত্রেরই কর্ত্তব্য কাৰ্য্য ও তাঁহার অভিপ্রেত। ঐশ্বরিক আদেশ পালন বা ঈশ্বরের নিকট কৃতজ্ঞতা স্বীকারের নাম ধৰ্ম্ম। জগতে নানাধৰ্ম্ম প্রচলিত আছে। তন্মধ্যে প্রধান এই কয়টা, যথা—মুসলমান ধৰ্ম্ম, হিন্দু ধৰ্ম্ম, ব্রাহ্ম ধৰ্ম্ম, বৌদ্ধ ধৰ্ম্ম, জৈন ধৰ্ম্ম, নানকপন্থী ধৰ্ম্ম, অগ্ন্যুপাসক ধৰ্ম্ম এবং জড়োপাসক।

মুসলমান ধৰ্ম্ম

মুসলমান ধর্ম্মের মূল ঈশ্বর ব্যতীত উপাস্য নাই। মোহাম্মদ (দরূদ) তাহার শেষ প্রেরিত সত্য তত্ত্ববাহক দাস। এই ধর্ম্মে সাকার দেব দেবীর উপাসনা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্রশংসিত প্রেরিত মহাপুরুষ আমাদিগকে পাপ হইতে বিরত থাকিয়া, পুণ্য কার্য্যে ব্ৰতী করার জন্য যে সকল উপদেশ দিয়াছেন, তজ্জন্য তাঁহার আনুগত্য স্বীকার এবং সেই জন্য তাঁহার নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের একান্ত কর্ত্তব্য। পাপ পুণ্যের জন্য মানবগণ ঈশ্বরের নিকট দায়ী। পাপ করিলে নরকে, পুণ্য করিলে স্বর্গে যাইতে হইবে। হজরত দাউদ (David), হজরত মুসা (Moses), হজরত ইসা (Christ) এবং হজরত মোহাম্মদের প্রতি ক্রমশঃ ৪ খানা ধৰ্ম্ম পুস্তক ঈশ্বর হইতে অবতীর্ণ হইয়াছে। তন্মধ্যে ৩ খানা রহিত এবং শেষাবতীর্ণ কোরাণ এখন বলবৎ আছে। স্বর্গীয় দূতগণের শাসন ক্ষমতা পৃথিবী ধ্বংস সাধন, মৃত্যুর পর শেষ বিচারার্থে পুনর্জন্ম দান, এমন কি সমুদয় জীব জন্তুর জন্ম মৃত্যু আয়ু উপজীবিকাদি সমুদয় ঈশ্বরের হস্তে ন্যস্ত। ভবিষ্যৎ কথা ঈশ্বর ব্যতীত কেহই জানে না। মুসলমান ভিন্ন অন্য ধর্ম্মাবলম্বীর মুক্তি নাই। মুসলমান ধর্ম্মে জাতিভেদ নাই। যে ঈশ্বরের আরাধনা করিবে, সেই ঈশ্বরের প্রিয় পাত্র, আত্মা অমর, মুসলমানগণ পরস্পর ভ্রাতা এবং এক জন অন্য জনের সাহায্য করিতে ধৰ্ম্মতঃ বাধ্য। মুসলমান ধৰ্ম্মে পৌরহিত্য ও শাস্ত্রধ্যাপনাধিকার কোন জাতি বিশেষের প্রতি একচেটিয়া ন্যস্ত নহে। যে ইচ্ছা করিবে, সেই শাস্ত্র পড়িতে কি শিক্ষা করিতে পারিবে। হজরতের বংশাবলী (সৈয়দদিগের জন্য) কোন শাস্ত্রিক ক্রিয়া আবদ্ধ নাই। দায়ভাগে কাহাকেও বঞ্চিত করে না। ৫টী বিষয়ের উপর মুসলমান ধর্ম্মের ভিত্তি স্থাপিত। ১। কলেমা পাঠ। ২। দৈনিক পঞ্চ নমাজ। ৩০টী রোজা (উপবাস)। ৪। ধনীর জন্য স্বীয় ধনের ১/৪০ ভাগ দরিদ্রকে দান (জাকাত)। ৫। হজ্জ। মুসলমান ধর্মে ঈশ্বরের আংশিক অর্চ্চনা নাই। অর্থাৎ ঈশ্বরের অংশ জানা ঘোরতর পাপ, ঈশ্বর আহার করেন না, জন্ম দেন না কি জাত হন নাই। তিনি একমাত্র ভাগ্য বিধাতা, তিনি পালনকৰ্ত্তা, রক্ষাকর্ত্তা, জন্মদাতা ও আহারদাতা। তাঁহার আদেশ ব্যতিত কোন কাৰ্য্য হইতে পারে না। সুরা পান, পরদার গমন, পর দ্রব্য হরণ, মিথ্যা বলা, বিশ্বাসঘাতকতা করা, সুদ গ্রহণ, জুয়া খেলা, ইত্যাদি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইসলাম ধর্ম্মে বিধবা বিবাহ ও ত্বকচ্ছেদ প্রথা প্রচলিত আছে। কারণ বশতঃ এক হইতে চারি বিবাহ করা এবং ঈশ্বরোদ্দেশে কোরবাণীর (পশু জবেহ করিয়া ঈশ্বরের নামে উৎসর্গ করা) বিধান রহিয়াছে। এই ধর্ম্মে তালাকের (স্ত্রী ত্যাগ)ও বিধান আছে। আর যে শ্রেণীর লোক হউক না কেন, সে মরিলে গ্রামবাসী সমুদয় মুসলমান তাহাকে সমাধিস্থ করিতে বাধ্য। স্বধর্ম্মাবলম্বী কি ভিন্ন ধর্ম্মাবলম্বী প্রতিবাসীর সাহায্য করার কথা লিখিত আছে। মুসলমানগণ প্রধানতঃ ২ ভাগে বিভক্ত যথা—সুন্নি ও সিয়া। সুন্নিগণ ধর্ম্ম কৰ্ত্তার সুন্নতের (দ্রষ্টব্য কাৰ্য্যের) সম্পূর্ণ অনুসরণকারী এবং হানিফি, মালেকি, শাফেই, হাম্বলি, এই ৪ মজহবের অধীনতা স্বীকার করে। ইহারা প্রেরিত মহাপুরুষের ৪ খলিফার (প্রতিনিধি) প্রাধান্য স্বীকার করেন। সুন্নিদের মধ্যে আরও বহুতর উপশাখা আছে; যথা—খারেজী, কদরিয়া ও ওহাবী প্রভৃতি। যাহারা নজদ নিবাসী মোহাম্মদ বিন আবদুল ওহাবের মতানুসরণকারী এবং ৪ মজহবের অধীনতা স্বীকার করেন না, তাহারা ওহাবী; আর যাহারা নমাজে রুকুর পর প্রত্যেক বার হস্ত উত্তোলন করে, তাহারা রফায়দান বা লা-মজহাবী। ইহারা ওহাবিদিগেরই একাংশ বিশেষ। যাহারা হজরতের সুন্নতের সম্পূর্ণ মতানুসরণ করে না, এবং হজরত আলি (রাজি.) ব্যতীত ৩ আছহাবের প্রাধান্য স্বীকার করে না, তাহারাই শিয়া বা রাফেজী। শিয়াদের মধ্যেও নানা শাখা আছে। ইসলাম ধর্মের কালক্রমে ৭৩ শাখা হইবে। তন্মধ্যে এক শাখা সুন্নত জমাত নাজি (স্বর্গবাসী) হইবে এবং সমস্ত ৭২ শাখা নারী (নরকগামী) হইবে। সমগ্র ইসলাম ধর্মের মূল এলমে মারুফল বা যোগ শাস্ত্র। যোগশাস্ত্রে দীক্ষিত না হইলে প্রকৃত মুসলমান হয় না। আধ্যাত্মিক জগতে কস্মিনকালেও জ্ঞান জন্মে না এবং ঈশ্বরকে প্রকৃত রূপে চিনে না। যাহা হউক, বাহুল্য বিবেচনায় ৭২ ফেরকার (শাখার) বিস্তারিত বিবরণ এই গ্রন্থে লিখিত হইল না। বড় বড় গ্রন্থে তাহা দ্রষ্টব্য।

খ্রীষ্টীয় ধর্ম্ম।

যীশু খ্রীষ্ট মেরীর (মরিয়ম) তনয় ছিলেন। তিনি অলৌকিক শক্তিশালী ছিলেন বলিয়া জনসাধারণের বিশ্বাস। যে গ্রন্থে এই বিশ্বাস লিপিবদ্ধ আছে, তাহা বাইবেলের নূতন প্রমাণ বলিয়া অভিহিত।[১] খ্রীষ্টিয়ানদিগের মতে এই গ্রন্থই সর্ব্বোৎকৃষ্ট। যোসেফের সহিত মেরী বাগদত্তা হইয়াছিলেন। তাঁহাদের সম্মিলনের পূর্ব্বে মেরী অন্তঃসত্বা হইয়াছিলেন। তৎপর যোসেফ তাঁহার সহধর্মিণীকে পরিত্যাগ করিতে ইচ্ছা প্রকাশ করিয়াছিলেন। কিন্তু স্বর্গীয় দূত স্বপ্নাবস্থায় তাঁহার নিকট উপস্থিত হইয়া মেরীকে পরিত্যাগ না করিবার জন্য উপদেশ দিলেন এবং সন্তানের নাম যীশু রাখিতে বলিলেন। যোহন, মথি, মার্ক্ক ও লূক যীশুর মৃত্যুর পর নুতন প্রমাণ নামক গ্রন্থ লিখিয়াছিলেন। যদিও তাঁহাদের লিখায় ঐক্য দেখা যায়, তথাপি খ্রীষ্ট ধর্ম্ম সম্বন্ধে উক্ত গ্রন্থ হইতে কোন উপদেশ পাওয়া যায় না। যীশু কি শিক্ষা দিয়াছিলেন, তাহা স্থির করিবার জন্য ৩৬৩ খ্রীঃ অব্দে এশিয়ামাইনরে একটা মহতী সমিতির অধিবেশন হইয়াছিল। তাহাতে স্থিরীকৃত হইয়াছিল যে, কেবল উল্লিখিত ৪ ব্যক্তির লিখা সত্য; অন্যান্যগুলি মিথ্যা। যোহনকর্ত্তৃক যীশু জল দ্বারা বাপ্তাইজ (ধর্মে দীক্ষিত) হইয়াছিলেন। পাইলেট নামক রাজা ক্রুশের দ্বারা যীশু খ্রীষ্টের হাত বিদ্ধ করিয়াছিলেন। কবর দেওয়ার তৃতীয় দিন মেরী যীশুকে দেখিয়াছিলেন। যখন জগতের বিনাশ কাল উপস্থিত হইবে, তখন তিনি স্বর্গ হইতে পৃথিবীতে অবতরণ করিবেন। তিনি মেঘমালা সহ আসিবেন এবং মৃত ব্যক্তিদিগকে কবর হইতে উঠিতে বলিবেন এবং তাহাদের বিচার করিবেন। তিনি এখন একটা সমুন্নত সিংহাসনে ঈশ্বরের দক্ষিণ পাশে উপবিষ্ট আছেন এবং স্বর্গ ও নরকের চাবি তাঁহার হাতে রহিয়াছে। যীশু ৫ খানা-রুটী, ২টী মৎস্য দ্বারা স্ত্রীলোক ও সন্তানগণ ব্যতীত আরও প্রায় ৫০০০ হাজার পুরুষকে খাওয়াইয়া ছিলেন। ইহাতে সকলেরই উদর পূর্ণ হইয়াছিল, এবং যাহা ভুক্তাবশিষ্ট ছিল তদ্দ্বারা দ্বাদশটী বাজরা পূর্ণ করিয়াছিলেন। জন স্বর্গে যাওয়ার সময় এই সকল দেখিতে লাগিলেন। স্বর্গে ১টা সিংহাসন স্থাপিত রহিয়াছে এবং তদুপরি চতুর্দ্দিকে একটা রামধনু সহ এক জন উপবিষ্ট আছেন এবং তথায় ২৪টা আসন রহিয়াছে, সিংহাসন সম্মুখে এটা প্রদীপ জ্বলিতেছে। তথায় বহু সংখ্যক পান পাত্র রহিয়াছে; এবং ৪টী পশু আছে, তাহাদের সম্মুখে এবং পশ্চাতে চক্ষু আছে। একখানা গ্রন্থ রহিয়াছে, তাহাতে ৭টী মোহর করা হইয়াছে, তাহার মধ্যে ও পৃষ্ঠদেশে যাহা লিখিত হইয়াছে, তাহা কেবল যীশুই পড়িতে পারেন। খ্ৰীষ্টান ধর্ম্ম মতে ঈশ্বর ৩টী ভিন্ন রূপে বিরাজিত; যথা—পিতা, পুত্র ও পবিত্ৰাত্মা। যীশু খ্রীষ্ট ঈশ্বরের পুত্র। পিতার কাৰ্য্য পৃথিবীর সৃষ্টি এবং পালন করা, পুত্রের কাৰ্য্য পাপীদিগকে উদ্ধার করা ও পাপের প্রায়শ্চিত্ত দেওয়া। পবিত্ৰাত্মার কাৰ্য্য লোককে ধর্ম্মপথে আনয়ন করা। বাইবেলে লিখা আছে, যীশু উপাসনা, প্রার্থনা ও উপবাস করিতেন। খ্ৰীষ্টধর্ম্ম মতে প্রত্যেক রবিবারে গির্জ্জায় গিয়া হাঁটু পাতিয়া আরাধনা করার রীতি প্রবর্ত্তিত আছে। ৩ স্বর্গে, ৩ মর্ত্তে। খ্রীষ্টানগণ ২ ভাগে বিভক্ত। রোমান ক্যাথলিক এবং প্রোটেষ্টাণ্ট। রোমান ক্যাথলিক মতাবলম্বিরা হিন্দুর ন্যায় মৃত সাধুদিগের ছবি ও কবরের পূজা করে, প্রোটেষ্টাণ্ট মতাবলম্বিরা তাহা করে না এবং রোমান ক্যাথলিক দিগকে প্রতিমা পূজক বলিয়া উল্লেখ করে। আমার ইচ্ছামত না হইয়া ঈশ্বরের ইচ্ছা মতে সমুদয় কাৰ্য্য হউক, এই প্রকার নীতি খ্ৰীষ্ট ধর্ম্মে আছে। ক্যাথলিক খ্ৰীষ্টানরা মাতা মেরীর ভজনা করে এবং ভজনালয়ে তাহার প্রতিমূৰ্ত্তি রাখে। যীশু পিটরের (রোমান ক্যাথলিকের ধৰ্ম্মাধ্যক্ষ) নিকট স্বর্গের চাবি দিয়া এই বলিয়াছিলেন যে, যাহাকে তুমি ইচ্ছা কর স্বর্গে প্রবিষ্ট করাইতে পারিবে, তদন্যথা কেহ স্বর্গে যাইতে পারিবে না, কিন্তু পিটরের প্রতিনিধি পোপের নিকট যে স্বর্গের চাবি আছে, প্রোটেষ্টাণ্টগণ একথা স্বীকার করে না। তুরস্ক সাম্রাজ্যর অন্তর্গত বয়তলহাম নগর যীশু খ্রষ্টের জন্মস্থান। রোমান ক্যাথলিক পুরহিতের যাবজ্জীবন বিবাহ করিতে পারে না। খ্রীষ্টানদিগের আরাধনার জন্য কোন বাধাবাধি সময় নির্দ্ধারিত নাই।

য়িহুদী ধৰ্ম্ম।

য়িহুদিগণ ঈশ্বরকে জীবন্ত, নিত্য ক্রিয়াশীল, বাঙ্ময় ও শাসনকর্ত্তা বলিয়া বিশ্বাস করে। যে গ্রন্থে এই বিশ্বাস লিপিবদ্ধ আছে, তাহা পুরাতন প্রমাণ নামে অভিহিত। ঈশ্বর সম্বন্ধে ধ্যান মননাদি বিষয় এবং মনুষ্য কিরূপে তাহার চিন্তা ও ধারণা করিবে, এতৎ সম্বন্ধে উক্ত গ্রন্থে কিছুই লিখিত হয় নাই, ঈশ্বর সম্বন্ধে সুধু নিম্নোক্ত বিষয়গুলি বর্ণিত হইয়াছে।

ঈশ্বর কোন ক্রম অবলম্বন করিয়া এই জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন। তিনি মনুষ্যকে স্বীয় প্রতিমানুযায়ী সৃষ্টি করিয়াছেন। তিনি মনুষ্যকে একটা উদ্যানে স্থাপিত করিয়া তৎস্থিত নিষেধিত বৃক্ষের ফল ভক্ষণে নিবারণ করিয়াছিলেন এবং তাহার পাপ জানিতে পারিয়া, তাহার প্রতি দণ্ডাজ্ঞা প্রচারিত করিয়াছিলেন ও তাহাকে সুখী করিবেন বলিয়া আশা দিয়াছিলেন। তিনি সারাও ও জারার তাবুতে যাতায়াত করিয়াছিলেন। ইব্রাহিম, মোজেস ও অন্যান্যের নিকট মানব মূর্ত্তি ধারণ করিয়া উপস্থিত হইয়া তাহাদের সঙ্গে কথা বলিয়াছিলেন এবং সিনাই পৰ্বতোপরি দণ্ডায়মান হইয়া মোজেসের প্রতি দশটী আদেশ প্রচারিত করিয়াছিলেন। তিনি যাকোবের সঙ্গে বাহুযুদ্ধ করিয়াছিলেন, নরহত্যাকারীকে শাস্তি দিয়াছিলেন, এবং পৃথিবীতে মহা জলপ্লাবন সংঘটন করিয়াছিলেন। তাহাতে নোয়া ব্যতিত আর সকলেই বিনষ্ট হইয়াছিল। তিনি তৎকালে তাহার করুণার প্রতিভূ স্বরূপ রাম ধনু প্রেরণ করিয়াছিলেন। তিনি আট্টালিকা নিৰ্ম্মাতাদিগকে নিৰ্ব্বাক্ করিয়া চতুর্দ্দিকে ছিন্ন ভিন্ন করিয়াছিলেন, তিনি এব্রাহিমকে এরূপ একটা স্থানে বাস করিতে আদেশ করিলেন যে, তথায় থাকিলে সমস্ত মানব পরিবার তাহার দরুণ সুখে বাস করিবে।

তিনি চুক্তি স্বরূপ তাহাকে একটী পুত্র প্রদান করিলেন, এবং পিতার বিশ্বাস পরীক্ষা করিয়াছিলেন। তিনি আইসাক ও য্যাকুবের নিকট স্বয়ং প্রকাশিত হইয়াছিলেন। মনুষ্যদিগকে ক্রীতদাস করিয়াছিলেন। তিনি ভোজ নির্দ্ধারিত করিয়াছিলেন। তিনি ঈজিপ্টবাসী পলাতকগণকে মান্না নামক খাদ্য দ্বারা খাওয়াইয়াছিলেন। তাহারা তৃষ্ণার্ত্ত হইলে শৈল বিদীর্ণ করিয়া তাহাদের তৃষ্ণা নিবারণ করিতেন। বজ্রধ্বনি ও বিদ্যুৎ যোগে তাহাদের প্রতি আইন প্রচার করিতেন। ঈশ্বর জগৎ ও তন্মধ্যস্থ সমস্ত সৃষ্টি করিয়া ক্লান্তি বোধ করিলেন এবং সপ্তম দিবস বিশ্রাম করিলেন। এই দিনে মনুষ্যগণ কাৰ্য্য হইতে বিরত থাকে। ঈশ্বর একদা একটী উদ্যানে সান্ধ্য স্নিগ্ধ সমীরণ সেবন করিয়া পরিভ্রমণ করিয়াছিলেন। তৎকালে তাঁহার বাণী শ্রুত হইয়াছিল এবং ঈশ্বরের আত্মা জল ও স্থলের উপর বিচরণ করিতে দেখা গিয়াছিল। ইস্রেল বংশীয়েরা পুরাতন প্রমাণ সম্পূর্ণ গ্রন্থ বলিয়া বিশ্বাস করিতেন না। যদিও যীশু য়িহুদী ছিলেন, তথাপি য়িহুদিগণ তাহাকে ঈশ্বরের একমাত্র প্রসূত পুত্র বলিয়া বিশ্বাস করিত না এবং যীশু কবরে প্রোথিত হওয়ার পর তৃতীয় দিন কবর হইতে উঠিয়া আকাশে উঠিয়াছিলেন এবং এখন ঈশ্বরের দক্ষিণ পার্শ্বে উপবিষ্ট আছেন, খ্ৰীষ্টিয়ানদিগের এই বিশ্বাস য়িহুদিগণ স্বীকার করে না। তাহারা বলে যে, যীশুর মৃতদেহ তাহার শিষ্যগণ কবর হইতে রাত্রে চুরি করিয়াছিল। তাহারা কবর হইতে মৃতদেহের পুনরুত্থান বিশ্বাস করে না। যীশু যে আপনাকে ঈশ্বরের পুত্র বলিতেন, তাহাতে য়িহুদীরা তাহাকে তিরস্কার করিত। যীশু আপনাকে কখন ঈশ্বরের পুত্র, কখন বা মনুষ্যের পুত্র বলিয়া উল্লেখ করিতেন। য়িহুদিদিগের আরাধনার নাকি সময় নির্দিষ্ট আছে।

পারসিক ধৰ্ম্ম বা অগ্ন্যুপাসক

পারসিকদিগের ধৰ্ম্মের সংস্থাপক জেরাদেশ বা জেরেষ্টার। ধৰ্ম্ম পুস্তকের নাম জেন্দাবেস্তা। অন্ধকার এবং আলো এই দুই বিষয়ই তাহাদের ধর্ম্মের সার। আলো এবং অন্ধকারের উপর প্রভু আছেন। আলোর কর্ত্তার নাম এমরজদ এবং তাহা হইতে সমুদয় আলো আসে। অন্ধকারের কর্ত্তার নাম এরহিমা। অন্ধকারের কর্ত্তা অপেক্ষা আলোর কর্ত্তা বলবান। সুতরাং যুদ্ধে আলোর কর্ত্তার জয় হইয়া থাকে। আলোর কাৰ্য্য ন্যায় এবং অন্ধকারের কার্য্য অন্যায়। তাহারা, শব দাহ কি প্রোথিত করে না। শব অনবৃত ভাবে কবরস্থানে রক্ষিত হয়। মৃত ব্যক্তির দক্ষিণ চক্ষু শকুনী ভক্ষণ করিলে পুণ্যের লক্ষণ মনে করে। তাহারা অগ্নি উপাসনা করিয়া থাকে। জেন্দাবস্তায় অনন্ত নরকের মত নাই। পার্সিরা অনন্ত নরক বিশ্বাস করে না। জেন্দাবস্তার মতে আত্মা নরকাগ্নিতে দগ্ধ হইয়া নিৰ্ম্মল হয়।

হিন্দু ধর্ম্ম

হিন্দুরা স্বহস্তে নিৰ্ম্মিত দেব দেবী পুজা করে। তাহারা প্রধানতঃ দুই সম্প্রদায়ে বিভক্ত। শাক্ত ও বৈষ্ণব। বৈষ্ণবেরা প্রাণী বধ করে না, নিরামিষ ভোজন করে। শাক্তের সুরা পান এবং বলিদান করে। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, এই ৩ মুর্ত্তিমান ব্যক্তিবিশেষকে ভিন্ন ভিন্ন অংশে ঈশ্বর বলিয়া আরাধনা করে। পরমেশ্বরের বহুলাবতার স্বীকার করে। হিন্দুরা প্রধানতঃ ৪ জাতিতে বিভক্ত, যথা—ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। ব্রহ্মার মুখ হইতে ব্রাহ্মণের জন্ম, বাহু হইতে ক্ষত্রিয়, উরু হইতে বৈশ্য এবং পা হইতে শূদ্রের জন্ম হইয়াছে। ব্রাহ্মণের জজন যাজন পৌরহিত্য, ক্ষত্রিয়ের যুদ্ধ বিদ্যা, বৈশ্যের হল কর্ষণ এবং শূদ্রের দাসত্ব কাৰ্য্য। ব্রাহ্মণ ব্যতীত অন্য কোন জাতি বেদ অধ্যয়ন করিলে নরকস্থ হইবে। ব্রাহ্মণের সংস্রব ব্যতীত কোন ধর্ম্ম কার্য্য সম্পাদন হয় না। এক জাতি অন্য জাতির অন্ন ভক্ষণ করে না। ঈশ্বর মনুষ্যাকৃতি ধারণ করিয়া পৃথিবীতে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। কোন কোন মানুষের মধ্যে ঈশ্বরত্ব প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে। জল, বায়ু, অগ্নি, রাজা, সূৰ্য্য এবং যোদ্ধাদিগকেও হিন্দুরা উপাসনা করিয়া থাকে। হিন্দু ধর্ম্মে সুরাপান, দেবতার সম্মুখে মনুষ্য বলিদান করা, জলে শিশু নিক্ষেপ, মৃত স্বামীর সহিত জীবিত স্ত্রীর সহমরণ বিধান আছে। কোন কোন পুস্তকে হিমালয় পর্বতকে স্বর্গরাজ্য বলিয়া লিখিত আছে। বেদে ৩৩ জন দেবতার নামোল্লেখ আছে। কিন্তু বর্ত্তমান হিন্দু জাতি ৩০ কোটি দেবতার সংখ্যা নির্দ্দেশ করিয়াছেন। হিন্দুরা শিবলিঙ্গ পূজা করিয়া থাকে। শ্রীকৃষ্ণ নামক ঘোষ তনয়, রাধিকা নাম্নী সুন্দরী গোপতনয়াকে লইয়া কুৎসিত লীলা খেলা করিয়াছিলেন। হিন্দু জাতি সম্পত্তি বণ্টনে পুত্র বর্ত্তমানে কন্যাকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করিয়া থাকে। পৌরাণিক হিন্দুগণ বিধবা বিবাহকে পাপের কাৰ্য্য মনে করে, মৃত দেহকে অপবিত্র জানে, এক জাতির শব অন্য জাতি স্পর্শ কি দাহ করিলে প্রায়শ্চিত্ত করিতে হয়। স্বয়ং বিষ্ণু রাজা দশরথের ঔরষে জন্ম গ্রহণ করিয়া রাম রূপ ধারণ করেন। তাহার স্ত্রী সীতাকে হরণ করার অপরাধে তিনি লঙ্কাধিপতি মহারাজ দশাননকে বধ করেন। পাপ পুণ্যের পরিমাণানুসারে মনুষ্য পুনঃ পুনঃ জন্ম ধারণ করে। গরুকে বিষ্ণু, জলকে নারায়ণ এবং গো-বিষ্ঠাকে পবিত্র মনে করে। বেদ, ভাগবৎ, স্মৃতি, পূরাণ, তন্ত্র এই চারটা বিষয়ের উপর হিন্দু ধর্ম্ম সংস্থাপিত। বেদ হিন্দুর প্রধান ধর্ম্ম পুস্তক, বেদ প্রধান (ব্রহ্মার বাণী) তন্নিম্নে স্মৃতি, তৎপর পুরাণ। যে স্থানে বেদ স্মৃতির পরস্পর অনৈক হইবে, সে স্থানে বেদই প্রমাণ। হিন্দুরা দিবা রাত্রিতে ৩ বার ঈশ্বরের আরাধনা করিয়া থাকে; যথা—প্রাতঃ ক্রিয়া, মধ্যাহ্ন ক্রিয়া এবং সায়ং ক্রিয়া। হিন্দুরা ভিন্ন ধর্ম্মাবলম্বীকে স্বধৰ্ম্মে আহ্বান করিতে পারে না।

ব্রাহ্ম ধৰ্ম্ম

ব্রাহ্মেরা নিরাকার পরমেশ্বরের উপাসনা করিয়া থাকে। তাঁহারা স্বহস্তে নির্ম্মিত মূর্ত্তি পূজাকে ঘৃণা করেন, তাঁহারা বলিদান করেন না। জাতি ভেদ স্বীকার করেন না। রাজা রামমোহন রায় এই ধর্ম্মের প্রতিষ্ঠাতা। ইহা সকল ধর্ম্মের সার নির্ব্বাচিত। বাঙ্গালার শিক্ষিত সম্প্রদায় ব্রাহ্ম ধর্ম্মের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করিয়া থাকেন। ব্রাহ্ম ধর্ম্মের কোন ধর্ম্ম পুস্তক নাই। মুসলমানেরা যেমন ধৰ্ম্ম কর্ত্তার মধ্যবর্ত্তিতা স্বীকার এবং আবশ্যকতা মনে করেন, ব্রাহ্মেরা তেমন কোন প্রেরিত পুরুষের আবশ্যকতা ও মধ্যবর্ত্তিতা স্বীকার করেন না। যদিও নববিধানী ব্রাহ্মগণ প্রেরিত পুরুষের অস্তিত্ব স্বীকার করেন বটে, কিন্তু তাহাদের আচার্য্য বাবু কেশবচন্দ্র সেনকে একজন প্রেরিত পুরুষ বলিয়া স্বীকার করেন। মানব জাতির প্রাণ অমর। মরিলে পর গাত্রোত্থান কি পরলোকে দেহ ধারণ করার কথা স্বীকার করেন না। বিবেকই তাহাদের ধর্ম্মবিষয়। ঈশ্বরের প্রতি তাহাদের সম্পূর্ণ নির্ব্ভর। পাপ পুণ্যের জন্য মানবগণ ঈশ্বরের নিকট দায়ী। পাপ পুণ্যের তিরস্কার পুরস্কার পরলোকে আছে বলেন। কোন ধর্ম পুস্তককে অভ্রান্ত মনে করেন না। ক্রমশঃ বিবেক যোগে সত্য প্রকাশ হইবে মনে করেন। তাহাদের মতে উপাসনার সময় নির্দ্ধারিত নাই।

ব্রাহ্মেরা কাহাকে ঘৃণা করেন না। সকলকে স্বধৰ্ম্মে আহ্বান করেন। সুরা পান, পরদার গমন, মিথ্যা বলা, চুরি করা, বিশ্বাসঘাতকতা করা, কপটতা প্রভৃতি ব্রাহ্ম ধর্ম্মে নিষিদ্ধ। বিধবা বিবাহ ও অসবর্ণ বিবাহ প্রচলিত আছে। ইহাদের মতে বাল্য বিবাহ দোষণীয়। এক স্ত্রী বর্ত্তমানে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করেন না। ভিন্ন জাতির হস্তে খাইতে নিষেধ নাই। এক ঈশ্বরকে সৃজন কর্ত্তা, আহারদাতা, রক্ষাকর্ত্তা এবং সংহারকর্ত্তা বলিয়া জানেন। তাঁহারা ব্ৰহ্মা, বিষ্ণু, শিব এই তিন মূর্তি বিশেষকে ঈশ্বর বলিয়া স্বীকার করেন না। পাপ পুণ্যের পরিমাণানুসারে পরলোকে আত্মা সুখ দুঃখ ভোগ করিয়া থাকে।

বৌদ্ধ ধর্ম্ম

গৌতম বৌদ্ধ ধর্ম্মের প্রবর্ত্তক। তিনি জাতিতে ক্ষত্রিয় রাজা ছিলেন। কুসংস্কার বর্জ্জিত বিশুদ্ধ ধৰ্ম্ম সংস্থাপনাৰ্থ তিনি পিতা মাতা স্ত্রী পুত্র এবং প্রিয় আত্মীয়াদি সহ সংসার মায়া পরিত্যাগ করিয়াছিলেন। বুদ্ধ শব্দের অর্থ জ্ঞানী। বৌদ্ধগণ প্রথমতঃ পৌত্তলিকতা ও জাতি বিচার পরিহার পূর্ব্বক বিশুদ্ধ জ্ঞানের অর্চ্চনা করিতেন। বৌদিগের দর্শন শাস্ত্রে নিম্নলিখিত অষ্টাবিংশ গুণের বিষয় লিখিত আছে; যথা, চারি ভূত—ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ। পঞ্চেন্দ্রিয়—চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, দেহ। জড় পদার্থের পঞ্চ গুণ—আকার, শব্দ, ঘ্রাণ, স্বাদ, সারাংশ। দুই জাতি পুরুষ ও স্ত্রী। তিনটা মূল অবস্থা চিন্তা, জীবনী শক্তি ও স্থান। মনোভাব প্রকাশক দ্বিবিধ উপায়—ইঙ্গিত ও বাক্য। সজীব পদার্থ নিচয়ের সপ্ত গুণ—স্থিতি স্থাপকত্ব, কাৰ্য্যোপযোগীত্ব, একীকরণ, স্থায়ীত্ব ধ্বংস ও পরিবর্ত্তন। ইন্দ্রিয় সকল ছয় শ্রেণীতে বিভক্ত করা হইয়াছে; যথা—পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা পদার্থ সমূহের জ্ঞান সঞ্চার, ষষ্ঠতঃ, স্মৃতির সাহায্যে মন দ্বারা পদার্থ নিচয়ের জ্ঞান উপলব্ধি। পদার্থ সমুহের গুণের অনুভূতিগুলিকে ইন্দ্রিয়ের সংখ্যানুসারে ছয় শ্রেণীতে বিভক্ত করা হইয়াছে; যথা, পদার্থ সমূহের অম্লত্ব ও মিষ্টত্বের অনুভূতিগুলিকে স্বাদের শ্রেণীতে ভুক্ত করা হইয়াছে। বৃক্ষ লাল বর্ণ ও গৃহ ইত্যাদিকে দর্শনের অন্তর্ব্ভুক্ত করা হইয়াছে। উত্তাপ শৈত্যাদিকে স্পর্শনের ও উচ্চ মৃদু শব্দ ইত্যাদি শ্রবণের অন্তর্ব্ভুক্ত করা হইয়াছে। এতদ্ব্যতীত আরও নিম্নলিখিত বিবিধ মনোবৃত্তিসমূহ কল্পনা করা হইয়াছে; যথা—সজীবত্ব, স্বাতন্ত্র, মনঃসংযোগ, তত্ত্বানুসন্ধান, উদ্যম, দৃঢ়তা, আনন্দ, ঔদাসীন্য, নিদ্রা, তন্ত্র, নির্ব্বুদ্ধিতা, প্রজ্ঞা, ধন লোলুপতা, সন্তোষ, ভয়, অবিমৃষ্যকারিতা, লজ্জা, নির্লজ্জতা, ঘৃণা, স্নেহ, সন্দেহ, বিশ্বাস, ভ্ৰম, শারীরিক বিশ্রাম, মানসিক বিশ্রাম, চপলতা, কর্ম্মতৎপরতা, কোমলত্ব, নমনীয়ত্ব, দক্ষতা, বাকসংযমত্ব, দয়া, ঈর্ষা, স্বার্থপরতা, গর্ব্ব, অহঙ্কার ইত্যাদি।

বৌদ্ধদিগের মতে মনুষ্য পূর্ণতা লাভ করিলে নির্ব্বাণ পাইতে পারে। ভিন্ন ২ ভাষ্যকার মতে নির্ব্বাণ শব্দের অর্থ ভিন্ন প্রকার প্রদত্ত হইয়াছে। কেহ নিৰ্ব্বাণকে আত্মার ধ্বংস বলিয়া উল্লেখ করেন এবং কেহ বা মন ও অন্তঃকরণের পাপের অবস্থা হইতে নিষ্পাপ শান্ত বিশুদ্ধ পূর্ণশান্তি ও জ্ঞানের অবস্থা উপস্থিত হওয়া বলিয়া ব্যাখ্যা করেন। তিব্বতবাসিগণের মতে নির্ব্বাণ শব্দ দুঃখের অবস্থা হইতে প্রমুক্ত মন বুঝায়। ক্রোধ, সুরাপান, অবাধ্যতা, গোড়ামী, প্রবঞ্চনা, দ্বেষ, আত্মশ্লাঘা, অন্যকে নিরুৎসাহ করা, অশুচির লক্ষণ। বৌদ্ধ ধর্ম্মের ৮টী উপদেশ নিম্নে প্রদত্ত হইল।

  1. কোন জীবের প্রাণ নাশ করা উচিত নহে।
  2. পরদ্রব্য গ্রহণ করা অকৰ্ত্তব্য।
  3. মিথ্যা বলা অনুচিত।
  4. নেশা উদ্দীপক পদার্থ গ্রহণ নিষিদ্ধ।
  5. অবৈধ উপায়ে পর স্ত্রী গমন অনুচিত।
  6. রাত্রিকালে অকালোচিত খাদ্য দ্রব্য গ্রহণ নিষিদ্ধ।
  7. মৃত্তিকার উপর মাদুর পাতিয়া শয়ন করা উচিত।
  8. পুষ্পমাল্য অথবা সুগন্ধি ধারণ নিষিদ্ধ।

মনের আগ্রহ সহকারে নিম্নলিখিত ৪টী বিষয়ের ধ্যান করা কর্ত্তব্য।

  1. শরীরের অপবিত্রতা সম্বন্ধে।
  2. ইন্দ্রিয় সম্ভোগ সদ্ভুত অপকার সম্বন্ধে।
  3. মানসিক অনুভূতির অচিরস্থায়ীত্ব সম্বন্ধে।
  4. জীবনের অবস্থাদি সম্বন্ধে।

প্রধান ৪টী বিষয়ে যত্নবান হইতে হইবে।

  1. মন্দ স্বভাব যেরূপে উদয় হয়, তাহা নিবারণ করা।
  2. যে সকল মন্দ প্রকৃতির উদয় হইয়াছে, তাহা দমন করা।
  3. যে উত্তম প্রকৃতির উদয় হয় নাই, তাহা উৎপন্ন করা।
  4. মনে সৎ প্রবৃত্তি না থাকিলে তাহা বৃদ্ধি করা।

সাধুত্বের চারিটী অবস্থা।

  1. সাধুত্ব লাভের ইচ্ছা।
  2. তদুপযোগী যত্ন ও চেষ্টা।
  3. তদুপযোগী অন্তঃকরণ গঠন।
  4. তত্ত্বানুসন্ধান।

নৈতিক ক্ষমতা পঞ্চবিধ।

বিশ্বাস, বল, স্মৃতি, ধ্যান, বিনা বিচারে কোন বিষয়ের সত্যতা অবিলম্বে উপলব্ধি করার মানসিক ক্ষমতা।

জ্ঞান সপ্তবিধ।

বল, স্মৃতি, চিন্তা, ধর্মগ্রন্থের তত্ত্বানুসন্ধান, আনন্দ, বিশ্রাম এবং শান্তি।

বৌদ্ধ ধৰ্ম্ম চীনে প্রবেশ করিয়াছিল। গৌতমের উপদেশ শিক্ষার জন্য জনৈক চীনদেশীয় দূত ভারতে প্রেরিত হইয়াছিল। ইহা তুর্কিস্থান, কাবুল ও মঙ্গোলিয়ায় বিস্তৃত হইয়াছিল। চীন হইতে ইহা কোরিয়ায় ও কোরিয়া হইতে জাপানে প্রবেশ করিয়াছিল। যে সকল চীন পর্য্যটক ভারতে আসিয়াছিলেন, তাহাদের মধ্যে হিউয়েনথ সঙ্গ ও ফাহিয়ান সঙ্গ ছিলেন। কনিকসের রাজত্বকালে আফগানিস্তানে বৌদ্ধধর্ম্ম বিস্তৃত হইয়াছিল, ষষ্ঠ শতাব্দীতে নেপালে বৌদ্ধ ধর্ম্ম প্রচলিত হইয়াছিল। তিব্বতের রাজধানী লাসায় গৌতম বুদ্ধের স্বর্ণ নির্ম্মিত প্রতিমূর্ত্তি আছে। পুরহিতগণ লামা নামে অভিহিত। তাহারা প্রধান লামাকে ধর্ম্মোপদেশক বলিয়া নির্ব্বাচন করে। তাহাদের বিশ্বাস এই যে, কোন না কোন ব্যক্তির মধ্যে বৌদ্ধের আত্মা বাস করে; এবং তাহাকে বিশ্বের প্রধান বলিয়া গণ্য করে ও পূজার উপযুক্ত বলিয়া মনে করে। অশোকের সময় বৌদ্ধধৰ্ম্ম অতিশয় পবিত্র ছিল। কোন বাহ্যিক আড়ম্বর ও পৌত্তলিকতা ছিল না। অশোক চারিটী গ্রীক রাজার নিকট দূত প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাহাদিগকে পরাজয় করিয়া স্বধৰ্ম্মে আনয়ন করিয়াছিলেন। তিনি সিংহলের রাজা টিসার নিকট স্বীয় পুত্র মাহিন্দকে প্রেরণ করিয়াছিলেন। বৌদ্ধ ঘোষ সিংহল হইতে ব্ৰহ্মদেশে গিয়া তথায় বৌদ্ধধর্ম্ম সংস্থাপন করিয়াছিলেন এবং শ্যাম দেশবাসী বৌদ্ধ ধর্ম্ম অবলম্বন করিয়াছিল। বৌদ্ধধর্ম্ম প্রচারকগণ ৬ষ্ঠ অথবা ৭ম শতাব্দীতে কলিঙ্গ হইতে যাবায় গিয়াছিলেন, এবং তথা হইতে বৌদ্ধধর্ম্মাবলী ও সুমাত্রা দ্বীপে বিস্তৃত হইয়াছিল। চীন পর্য্যটক হিউয়েন্থ সঙ্গ, ভারত পরিত্যাগের অব্যবহিত পরেই কুমারিল ভট্ট ও শঙ্করাচার্য্যের প্ররোচনায় হিন্দুগণ কর্ত্তৃক উৎপীড়িত হইয়াছিলেন। অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে বৌদ্ধধৰ্ম্ম এত দূষিত হইয়াছিল যে, ইহা আর জনসাধারণের মনোযোগ আকর্ষণ করিতে পারিল না এবং যখন ইহা রাজাদের অনুগ্রহ হইতে বঞ্চিত হইল, তখন পুরোহিতদিগের বাধার বিরুদ্ধে ইহা দণ্ডায়মান হইতে সক্ষম হইল না। দ্বাদশ শতাব্দীতে যখন মুসলমানগণ কর্ত্তৃক কাশ্মীর বিজিত হইয়াছিল, তখন অল্প সংখ্যক বৌদ্ধ ধর্ম্মাবলম্বী ব্যতীত ভারতবর্ষে আর বৌদ্ধ ছিল না।

বুদ্ধদেবের সময় যেরূপ বিশুদ্ধ নীতি প্রচলিত ছিল, এখন আর সেরূপ নাই। নানা স্থানে নানা ভাবে বৌদ্ধধৰ্ম্ম প্রচলিত রহিয়াছে। তিব্বতীয়দের বিশ্বাস তাহাদের ধৰ্ম্ম-পুরোহিত লামার মৃত্যু নাই। হবে তিনি দেহান্তরে প্রবেশ করেন মাত্র। তিব্বত দেশে বুদ্ধদেবের প্রতিমূর্ত্তি আছে, লামা কখনও বিবাহ করিতে পারেন না।

অপর পুস্তকে বৌদ্ধ ধর্ম্ম সম্বন্ধে লিখিত আছে, বৌদ্ধেরা অহিংসাকেই পরম ধৰ্ম্ম জ্ঞান করে। ইহাদের মতে পরলোক নাই, ইহলোকেই যে কিছু সুখ দুঃখ হয়, তদ্ব্যতীত জীবাত্মাকে কোন কষ্ট করিতে হয় না। ইহাদের মধ্যে বহুতর মতভেদ আছে। কোন কোন মতে পরমেশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করে। কোন কোন মতে বলে যদিও পরমেশ্বর থাকেন, তাহার আরাধনা করার কোন ফল নাই। কোন কোন মতে কতিপয় মহাপুরুষকে ঈশ্বর বোধে আরাধনা করে। এই সকল মহাপুরুষেরা লামা প্রভৃতি নামে প্রসিদ্ধ। বৌদ্ধদিগের ধর্ম্ম শাস্ত্র দয়ারত্ন, বৃহস্পতি সূত্র, অঙ্গচরিত্র ইত্যাদি। বৌদ্ধ দিগের মতে যাগ যজ্ঞ ক্রিয়াকাণ্ড নিষ্ফল। বুদ্ধ কহেন, কাম ক্রোধ প্রভৃতি রিপুগণ মনুষ্যের দুঃখের কারণ। সমাধি বলে এই সকল রিপু নির্ম্মূল করা কর্ত্তব্য। বুদ্ধদেব সমুদয় শ্রেণীর লোককে আপনার মতে দীক্ষিত করিতেন। বুদ্ধের মত তাহার শিষগণের মুখে মুখে চলিয়া আসিতেছিল। তাহার মৃত্যুর পর তদীয় ৫০০ শিষ্য এর মৌখিক উপদেশ সমূহ গ্রন্থবদ্ধ করিবার নিমিত্ত রাজগৃহের নিকট সমবেত হয়েন। শিষ্যগণ বুদ্ধের সমুদয় উপদেশ ও মত আবৃত্তি করিয়া ৩টা প্রধান অংশে বিভক্ত করেন। এই ৩ অংশের বিষয় ধৰ্ম্ম গ্রন্থের ৩ ভাগে বিবৃত হয়। বৌদ্ধদিগের এই সভা ‘সঙ্গতি’ নামে প্রসিদ্ধ। যীশু খ্রষ্টের জন্মের ৪৪৭ বৎসর পূর্ব্বে বুদ্ধ মানবলীলা সংবরণ করেন। বৌদ্ধদিগের মতে জীবাত্মাকে কষ্ট দেওয়াই পাপ। বৌদ্ধেরা বিশ্বাস করে, বহুকাল সংক্ৰিয়া ধ্যান ধারণ ও সমাধি অবলম্বন করিলে, মনুষ্য ক্রমশঃ এরূপ জ্ঞানাপন্ন হয় যে, অবশেষে কিছুই তাহার অবিদিত থাকে না ও সে স্বয়ং ঐশ্বরিক শক্তি প্রাপ্ত হয়। ইহাদের নাম বহু জ্ঞান লাভ করন বা বোদ্ধ হওন। বুদ্ধের মতে সংসার দুঃখময়। দুঃখের কারণ মানুষের সংসারে অনুরাগ। এই অনুরাগ নিবৃত্তি হইয়া বিরাগ উৎপন্ন হইলে দুঃখের অবসান হয়। বিরাগ উৎপাদনের উপায়াবলম্বন কোন বিষয়ে বাড়াবাড়ি না করা।

জৈন ধর্ম্ম

নিগ্রন্থনাথ মহাবীর জৈন ধর্ম্ম প্রচার করেন। বৈশালির নিকটস্থ একটা পল্লীতে মহাবীরের জন্ম হয়। মহাবীরের পিতার নাম সিদ্ধার্থ। যৌবনাবস্থায় পিতৃবিয়োগ হইলে মহাবীর সন্ন্যাস আশ্রম গ্রহণ করেন। জৈন ধর্ম্ম বৌদ্ধ ধর্মের ন্যায় প্রাচীন। জৈন ভিক্ষুকগণ অহিংসা, সুনৃত, অন্তেয়, ব্রহ্মচর্য ও অপরিগ্রহ, এই পঞ্চব্রত পালন করিয়া থাকেন। জৈনেরা ঈশ্বরের অস্তিত্ব ও তাহার মহিমা স্বীকার করে না। কেবল বস্তুর নিত্যতা স্বীকার করে। ইহাদের মতে অহিংসা পরম ধর্ম্ম। জৈনদিগের মধ্যে যাহারা সাধু, তাহারা ভিক্ষালব্ধ অন্ন মাত্র আহার, শুক্ল বস্ত্র পরিধান ও লুঞ্চিত কেশ ধারণ করিয়া থাকে। তাহারা নিঃশব্দ ও অত্যন্ত ক্ষমাশীল; জৈলবীরা বস্ত্র পরিধান করে না। লুঞ্চিত বেণী রাখেন ও হস্তে পিচ্ছিলিকা ধারণ করিয়া থাকেন। যখন কোন স্থানে যাইবার আবশ্যক হয়, তখন জীবহত্যা ভয়ে হস্তস্থিত পিচ্ছিলিকা দ্বারা অর্থে পথ হইতে পিপীলিকাদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণী সকল অপসারিত করিয়া পশ্চাৎ পদ প্রক্ষেপ করেন। ইহারা জল পাত্র ব্যবহার করে না। হস্ত দ্বারাই জলপান করিয়া থাকেন। কখনও একাকী আহার করে না। ইহারা স্ত্রী সহবাস-সুখে একান্ত বিরত। অধুনা রাজপুতনা, কানাড়া ও গুজরাট প্রদেশে জৈন দৃষ্ট হয়। অর্হিতদিগের মধ্যে যে সম্প্রদায় আছে, তাহা দিগকেই জৈন বলে।

নানক পন্থী

নানক শিখ সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা। ১৪৬৯ খৃঃ অব্দে লাহোরের ১০ মাইল দক্ষিণে কানাকুচা গ্রামে নানকের জন্ম হয়। নানকের পিতার নাম কালুদেব। কালুদেব ক্ষত্রিয় বলিয়া প্রসিদ্ধ। নানক অল্প বয়সে লিখা পড়া শিখিয়া শুদ্ধাচারী ও চিন্তাশীল হয়েন। ক্রমে সাংসারিক কার্য্যে তাঁহার বিরাগ জন্মে। তিনি সন্ন্যাসীর বেশে ভারতবর্ষের অনেক স্থানে পরিভ্রমণ করেন। নানক আরবের মরুভূমি অতিক্রম করিয়া মক্কা[২] যাইতে কুণ্ঠিত হয়েন নাই। এই সকল স্থানের সাধু যোগী ফকিরদিগের কার্য্য কলাপ দেখিয়া নানক স্বদেশে গিয়া গুরুদাসপুর জেলার ইরাবতী তটে কীর্ত্তিপুর গ্রামে একটা ধৰ্ম্মশালা স্থাপন পূৰ্ব্বক তথায় বাস করেন। এখানে ১৫৩৯ খৃঃ অব্দে ৭১ বৎসর বয়সে তাঁহার মৃত্যু হয়। তাঁহার মতে বিশুদ্ধ হৃদয় অদ্বিতীয়।

ঈশ্বরের উপাসনা করিলেই ধৰ্ম্ম প্রচার করা হয়। নানকের শিষ্যগণ শিখ নামে প্রসিদ্ধ। নানক বহুবিধ পুস্তক হইতে স্বীয় মতানুসারে সার সংগ্রহ করিয়া এই ধর্ম্ম প্রচার করেন। ইহাদের মতে আত্মা অবিনশ্বর এবং পুণ্য বলে লোক অনন্ত সুখধামে উপস্থিত হইতে পারে। শিখেরা গোহত্যাকে অতিশয় পাপজনক মনে করে। কিন্তু গোমাংস ভিন্ন সকল প্রকার মাংসই ইহাদেরই খাদ্য। শিখদিগের মতে জাতিভেদ নাই। শিখেরা তামাক খাওয়াকে পাপ মনে করে। কিন্তু সুরাপান দোষণীয় মনে করে না। আদি গ্রন্থ শিখদিগের প্রধান ধর্ম্মপুস্তক। গুরুগোবিন্দ ইহা রচনা করেন। অমৃতসরের শিখেরা একত্র হইয়া গীতি পাঠ করেন ও স্বজাতীয় ধর্ম্মীষ্ঠদিগের মধ্যে খিচুড়ি বিতরণ করিয়া থাকেন। ইহাই তাহাদের ধৰ্ম্মকার্য্য মধ্যে পরিগণিত। এই স্বর্ণমন্দির দেখিবার জিনিস বটে।

জড়োপাসনা।

মুসলমান, হিন্দু, খ্রীষ্টান প্রভৃতি ৫ প্রকার ধর্ম ব্যতীত পৃথিবীতে আরও অনেক প্রকার ধৰ্ম্ম প্রচলিত আছে ও ছিল। তন্মধ্যে কোন কোন ধর্ম্মাবলম্বী লোক এতই মূর্খ ও অজ্ঞান যে, সৰ্ব্বশক্তিমান্ বিশ্বকৰ্ত্তা পরমেশ্বরের অস্তিত্ব পৰ্য্যন্ত অবগত নহে। বৃক্ষ, বায়ু, জল প্রভৃতি যে কোন পদার্থের কোন বিশেষ ক্ষমতা দেখে, তাহাকেই ঈশ্বর জ্ঞানে অৰ্চ্চনা করে। তাহারা দেখিতে পায়, অগ্নি নিমেষ মধ্যে গৃহাদি দগ্ধ করিয়া ফেলে। প্রবল বায়ু উপস্থিত হইলে ঘোর প্রলয় উপস্থিত হয় । মেঘ ভীমনাদে গর্জ্জন করে এবং তাহা হইতে অগ্নি শিখা নিঃসৃত হয়। এই সকল ব্যাপার কি নিমিত্ত ঘটে, তাহারা ভাবিয়া কুল পায় না। সুতরাং এই সকল জড় পদার্থকে অলোকিক শক্তি সম্পন্ন জ্ঞান করিয়া দেবতা বোধে পূজা করিয়া থাকে। এই প্রকার লোকদিগকে জড়োপাসক ও ইহাদের ধর্ম্মকে জড়োপাসনা বলে।

টিকা ও মন্তব্য

  1. ১.↑
    ভূতপূর্ব্ব খ্রীষ্টান মিসনরি জন জমিরদ্দি লিখিয়াছেন, হিব্রু বাইবেলের সহিত, গ্রীক বাইবেলের ঐক্য নাই।
  2. ২.↑
    নানকের মক্কা যাওয়া কতদুর সত্য, তাহা বলা যায় না।