কোরান শরিফ ঈশ্বর প্রদত্ত গ্রন্থ নয় বলিয়া বিধর্ম্মীরা যে সন্দেহ করিয়া থাকেন, ক্রমান্বয়ে তাহার সত্যতার প্রমাণ নিম্নে লিপিবদ্ধ করা যাইতেছে ।
- ইহার প্রচলন হইতে অদ্য পর্য্যন্ত কেহই ইহার লেখকের নাম বলিতে পারে নাই।
- গ্রন্থকার মাত্রেই স্বরচিত গ্রন্থে নাম প্রকাশিত করিয়া বিদ্বান সমাজে প্রতিপত্তি লাভ করিতে চাহেন, ইহা স্বতঃসিদ্ধ কথা; যদি কোরান শরিফ মনুষ্য কৃত হইত, তবে অবশ্যই গ্রন্থকারের নাম প্রদত্ত হইত।
- মনুষ্য কৃত গ্রন্থ কখনই নিরপেক্ষ হয় না। স্বার্থপরতায় জড়িত থাকে। কিন্তু এই পবিত্র গ্রন্থ স্বার্থপরতা কি অন্যবিধ বৃথা বাগাড়ম্বর দোষ বিবর্জ্জিত।
- ইহার ভাষা এত বিশুদ্ধ এবং শ্রুতি মধুর যে, কেহই এ পৰ্য্যন্ত ইহার মত একটা শব্দ লিখিতে সক্ষম হয়েন নাই। শেষ প্রেরিত মহাপুরুষ যে সময়ে ধর্ম্ম প্রচার করেন, তখন সমগ্র আরব দেশে পৌত্তলিক-ধৰ্ম্ম বিরাজমান এবং সকলেই হজরত মোহাম্মদের (দঃ) ঘোর শত্রু ছিল। পণ্ডিত মণ্ডলী তাঁহার নিন্দা সূচক করিতা রচনা করিয়া জনসাধারণের নিকট প্রচার করিতেন। সুতরাং ইহাও সম্ভবপর নহে যে, হজরত কোন বিধর্ম্মী পণ্ডিতের সাহায্যে এই মহাগ্রন্থ প্রস্তুত করিয়া থাকিবেন। তিনি ধর্ম প্রচারের প্রথম দিবস হইতেই এই কোরাণের সাহায্যে প্রচার করিতে ছিলেন। সুতরাং ইহাও কেহ বলিতে পারিবেন না যে, তাহার শিষ্য পণ্ডিতগণ পরে এই গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন।
- কোরাণ শরিফ চির হিতকর ও অকপট উপদেশ পূর্ণ ও অশ্লীলতা দোষ বিরহিত।
- ধৰ্ম্ম প্রবর্ত্তক লিখা পড়া জানিতেন না, একজন নিরক্ষর (উম্মি) লোকের দ্বারা এরূপ অদ্ভুত ও বিস্ময়কর উৎকৃষ্ট গ্রন্থ বিরচিত হওয়া একেবারেই অসম্ভব। সুতরাং কোরাণ যে ঈশ্বর প্রদত্ত মহাগ্রন্থ, তাহাতে আর কোন সন্দেহ নাই।
পরলোকের অস্তিত্ব
আধুনিক বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিকদের মতে পরলোক নাই। কিন্তু মুসলমানেরা পরলোকের অস্তিত্ব[১] স্বীকার করেন। যাহা হউক, পরলোকের অস্তিত্ব সম্বন্ধে কতিপয় প্রমাণ নিম্নে প্রদর্শিত হইতেছে।
পরীক্ষা স্বরূপ ইহলোকে ঈশ্বর মনুষ্য হস্তে ক্ষমতার্পণ করিয়া, ন্যায় অন্যায় এই দুইটা বিষয় নির্দ্দিষ্ট করিয়াছেন এবং উভয় কাৰ্য্য করা না করার অধিকার (স্বাধীনতা) মানব জাতির প্রতি অর্পণ[২] করিয়াছেন। সুতরাং সে ক্ষমতা যথোচিত রূপে চালিত হইয়াছে কিনা, অর্থাৎ ঐহিক সদসৎ পুরস্কার এবং তিরস্কারের ফল[৩] প্রদর্শন করণার্থে একটী স্বতন্ত্র স্থানের আবশ্যক।
অতএব পরলোকের সৃজন করিয়াছেন[৪], এবং তাহার আবশ্যকতা দেখাইয়াছেন। পরলোক চিরস্থায়ী এবং তথাকার অধিবাসীরা অমর। ২য়তঃ এই সংসারে কি বড়, কি ছোট সকলের জীবনই অশান্তিময়। আজ কাহারও আর্থিক চিন্তা, কাল হয়ত কাহারও আত্মীয় জনের মৃত্যু জনিত শোক, আর পরস্ব হয়ত কেহ পীড়িত, ফলত কেহই সুখী নহে। তৃতীয়তঃ আরও দেখা যায়, অনেক সাধু লোক নিরর্থক যন্ত্রণা ও দুর্দ্দশাগ্রস্ত। আবার অনেক অধাৰ্ম্মিক পরম সুখে কালযাপন করিতেছে। অতএব ইহা দ্বারা সুস্পষ্ট রূপে প্রতীতি হইতেছে যে, পরিতৃপ্তি হওয়ার জন্য স্বতন্ত্র স্থান রহিয়াছে; সেই স্বতন্ত্র স্থানই পরলোক। পরলোক না থাকিলে কাহারও মৃত্যু হইত না। সমুদয় ধর্ম্মেই ন্যূনাধিক পরলোকের অস্তিত্ব প্রদর্শিত হইতেছে।
মৃত্যুর পর গাত্রোত্থান।
যে পৃথিবীতে কোন সময় তোমার অস্তিত্বের কোন নাম গন্ধ ছিল না, সে স্থলে যিনি তোমাকে বিকাশ করিয়া জীবন দান করিয়াছেন এবং পুনরায় জীবন হরণ করিবেন, তাহার পক্ষে পরলোকে তোমাকে পুনঃজীবন দান করিয়া দেহ ধারণ করান আশ্চর্য কি? ফলতঃ যে কুম্ভকার বারৈক গড়িতে পারে এবং দিতে পারে, সে কেন পুনরায় নির্ম্মাণ করিতে অসক্ত হইবে? মনে করুন, নিদ্রিত ব্যক্তি আর মৃত ব্যক্তি একই সমান। সেই নিদ্রা হইতে যখন গাত্রোত্থান করিতে পারে, তখন মৃত্যুর পর কি জীবন ধারণ করিতে পারে না?
পথ প্রদর্শকের আবশ্যকতা।
পৃথিবীতে যত কাৰ্য্য আছে, সকল কার্য্যেই জনৈক শিক্ষকের প্রয়োজন। বিনা শিক্ষকে কেহ কোন বিষয় শিক্ষা করিতে পারে না। মনে করুন, আপনাকে কনষ্টাণ্টিনোপল নগরে যাইতে হইবে, কিন্তু আপনি ঐ নগরের রাস্তা আদৌ জানেন না; সুতরাং জনৈক পথ প্রদর্শকের প্রয়োজন। অতএব ঈশ্বর ধর্ম্মপথ দেখাইবার অভিপ্রায়ে পথ প্রদর্শক বা রছুলগণকে অবনী মণ্ডলে প্রেরণ করিয়াছেন। পথ প্রদর্শক ব্যতীত চলিলে গন্তব্য স্থানে পঁহুছিবার আশা অতি অল্প; বরং হিংস্র শ্বাপদ কর্ত্তৃক প্রাণ নষ্ট বা কোনও ভীষণ কণ্টকাকীর্ণ অরণ্যে দিশাহারা অবস্থায় জীবনান্ত হওয়ার আশঙ্কাই অধিক।
পর পর ৪ খানি পবিত্র গ্রন্থ অবতীর্ণ হওয়ার আবশ্যকতা।
প্রকৃত পক্ষে বলিতে গেলে আদিম মূল ধর্ম্মের পরিবর্ত্তন হয় নাই, বরং তাহার সংস্কার হইয়া আসিতেছে মাত্র। দৃষ্টান্ত স্থলে যেরূপ দেশ কাল পাত্রানুসারে ইংরেজ গবর্ণমেণ্টের আইন কানুন পরিবর্ত্তন হইয়া থাকে, সেই রূপ পূর্ব্বোক্ত ধর্ম্ম নিয়ম সমূহের পরিবর্ত্তন হইয়াছে। মনে করুন এক জন মুন্সেফ বর্ষা কালে পিয়নের নৌকা ভাড়া লওয়ার আদেশ দিলেন; কিন্তু শীত কালে কি সেই আদেশ বলবৎ থাকিবে? বরং তা রহিত হইবে।
২য় প্রমাণ এই যে, ১৮৯৭ সালে ডাকাইত এবং ব্যাঘ্রাদি হিংস্র জন্তুর প্রাদুর্ভাব প্রযুক্ত, গবর্ণমেণ্ট আত্মরক্ষার জন্য অসি এবং বন্দুক ধারণের আদেশ দিয়াছিলেন, কিন্তু ১৮৯৮ সালে সেই ভয় তিরোহিত হইল। তখন কি গবর্ণমেণ্ট প্রজাদিগের প্রতি পূৰ্ব্ববৎ বন্দুক প্রভৃতি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের হুকুম বলবৎ রাখিবেন? কখনই না; অবশ্য সেই আদেশ রহিত হইবে।
৩য়। রোগ থাকা কালে চিকিৎসক রোগীর প্রতি যে পথ্য ব্যবহারের উপদেশ দিবেন, সেই রোগী আরোগ্য হইলে কি পূর্ব্ব পথ্য বলবৎ রাখিবেন? কখনই না।
৪। শিক্ষক বালককে স্কুলে প্রবিষ্ট হওয়া কালে যে বহি পড়িতে আদেশ দিবেন, সেই বালক যখন ক্রমশঃ কলেজে পাঠারম্ভ করিবে, তখন প্রফেসার তাহাকে কি সেই বহি পড়াইবেন? না, অবশ্য প্রথম শিক্ষার বহি পরিবর্ত্তিত হইবে।
পৃথিবীর ধ্বংস (কেয়ামত বা মহা প্রলয়)
কোন কোন পণ্ডিত বলেন, পৃথিবীর কাৰ্য্য যে ভাবে চলিয়া আসিতেছে, এই ভাবে চিরকাল থাকিবে; তাহার ধ্বংস হইবে না। নিত্য পরিদর্শন এবং অভিজ্ঞতাই সমুদয় বিজ্ঞানের বীজ। আমরা ইতস্ততঃ দেখিতে পাই মনুষ্য, পশু, পক্ষী, কীট, পতঙ্গ, বৃক্ষ প্রস্তর প্রভৃতি ঈশ্বরের সমূদয় সৃজিত বস্তু ধ্বংস হইতেছে ও হইবে। তবে কোন বস্তু অধিক দিন, কোন বস্তু অল্প দিন স্থায়ী থাকে এই মাত্র পার্থক্য। মনে করুন, এক শত বৎসর পূর্ব্বে আপনার পিতামহ যে বৃক্ষ রোপণ করিয়াছিলেন, আপনার সময়ে সে বৃক্ষ মরিয়া যাইতেছে। ৪/৫ শত বৎসর পূর্ব্বে আপনার অতিবৃদ্ধ প্রপিতামহ যে অট্টালিকা নিৰ্ম্মাণ করিয়া গিয়াছেন, তাহা ক্রমশঃ ভগ্নাবস্থায় পরিণত হইয়া একে একে ইটগুলি খসিয়া পড়িতেছে। এমন কি, কিছুদিন পরে তাহার নাম পর্য্যন্ত বিলুপ্ত হইবে। মনে করুন, ২৫ বৎসর পূর্ব্বে পৃথিবীর যে গতি ছিল, অর্থাৎ যে সময় শীত গ্রীষ্ম বর্ষা অনুভূত হইত এবং ভূমির যেরূপ উর্ব্বরতা শক্তি ছিল, আজি কালি তাহার অনেক ইতর বিশেষ হইতেছে। মনুষ্যের মরণ কালে স্বাভাবিক নিয়ম যে প্রকারে পরিবর্ত্তন হয়, অন্য সময়ে তদ্রূপ দৃষ্ট হয় না। অতএব পৃথিবীর ধ্বংস কাল নিকটবর্ত্তী বোধ হইতেছে। বিশেষতঃ সকল ধর্ম্মাবলম্বীরাই পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার কথা স্বীকার করেন।
স্বর্গীয় দূতের অস্তিত্ব।
ঈশ্বর সাক্ষাৎ সম্বন্ধে মানব জাতির সহিত কোন কার্য্য করিতে পারেন; তজ্জন্য মধ্যবর্ত্তীর আবশ্যক।[৫] এই মধ্যবর্ত্তী বা দূতেরাই মালায়েক (ফেরেশতা) নামে অভিহিত। স্বর্গীয় দূতশ্রেণী আহার নিদ্রা এবং ইন্দ্রিয়াভিলাষী নহেন। অদৃশ্য ভাবে নিষ্পপাবস্থায় ঈশ্বরের কাৰ্য্যে নিয়ত নিয়োজিত রহিয়াছেন। যদি তাহারা দৃশ্যমান হইতেন, তবে মহা অসুবিধা হইত। যদি কেহ বলেন স্বর্গীয় দূত না হইলে কি ঈশ্বরের কাৰ্য্য চলিত? তদুত্তরে ইহা বলা যাইতে পারে, পৃথিবী চন্দ্র, সুৰ্য্য, মনুষ্য আদি না হইলে কি ঈশ্বরের কোন কার্যের প্রতিবন্ধকতা ঘটিত?
শয়তানের অস্তিত্ব।
আধুনিক বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিকদিগের মতে শয়তান বলিয়া কোন একটা অদৃশ্য মনুষ্য-রিপু নাই। মানব জাতির পুণ্য কাৰ্য্যে বাধা দিবার জন্য ঈশ্বর পরীক্ষা স্বরূপ শয়তানের সৃষ্টি করিয়াছেন। যদি পৃথিবীতে শয়তান না থাকিত তবে পৃথিবীতে পাপের নাম গন্ধ থাকিত না এবং সদসৎ কার্য্যের পরীক্ষার সুযোগ হইত না। পাপের প্রলোভনই শয়তানের কাৰ্য্য। যদি বল যাহা চক্ষুর অগোচর তাহার স্থায়ীত্ব নাই। বায়ু অদৃশ্য বস্তু, তাহার আকার এবং স্থিতি নাই; যদি বল বায়ু আছে, তবে শয়তানও আছে বলিলে ক্ষতি কি? এমন অনেক পাপ আছে, যাহা মনুষ্যের জ্ঞান থাকা সত্বেও করে এবং পাছে তজ্জন্য অনুতাপ করে, বুঝিয়াও বুঝে না। অতএব তাহাতেই শয়তানের গুপ্ত অস্তিত্ব ও গুপ্ত প্রলোভন বেশ অনুভূত হয়। অদৃশ্য শরীরী জীব অবশ্য আছে, ভৌতিক ঘটনা তাহার প্রত্যক্ষ প্রমাণ। সুপ্রসিদ্ধ প্রবীণ ব্রাহ্ম বাবু ৺রাজনারায়ণ বসুর দেওঘরস্থ বাসগৃহেও একদা ভূতের উৎপাত হইয়াছিল। সুপ্রসিদ্ধ হাসান খান জিন্নি, জিনের সাহায্যে অনেক অলৌকিক ঘটনা লোককে দেখাইয়া গিয়াছেন, একথা কলিকাতাবাসিগণ আজিও বিস্মৃত হন নাই। বিলাতী বড় বড় সংবাদপত্রে অনেক আশ্চর্য্য ভৌতিক ঘটনার বিবরণ লিপিবন্ধ দেখা যায়।
টিকা ও মন্তব্য
- ১.↑প্রতিপক্ষ দিগের যুক্তি এই—পরকাল যে আছে তাহার কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় না। কেহ সে অবস্থা দেখিয়াছেন এমনও শ্রুত হওয়া যায় না। সুতরাং তাহার স্বত্বা ও নাই। ইহার উত্তর জন স্টুয়ার্ট মিল এইরূপ দিয়াছেন যে, যে পদার্থের স্বত্বা বিচার হইতেছে, সেটা যদি এ জগতের পদার্থ বলিয়া বর্ণিত হইত, এবং অদ্যাবধি কোন মনুষ্যই দেখে নাই এরূপ প্রমাণিত হইত, তাহা হইলে সেই বস্তুটী নাই বলিলে অযৌক্তিক হইত না। যেমন যদি কেহ বলেন, ডুমুরের ফুল আছে। অথচ জগৎ শুদ্ধ লোকে শত শত বৎসর ধরিয়া সকল সময়ে সকল অবস্থায় ডুমুরের বৃক্ষ দেখিতেছে; কিন্তু অদ্যাপি কেহ তাহার ফুল দেখিল না। কারণ সেই বস্তুটা এই জগতের বস্তু। পরকাল সম্বন্ধে সেরূপ বলিবার সাধ্য নাই, সে অবস্থাটা এ জগতের অবস্থা নয়, সুতরাং তাহা প্রত্যক্ষ করিবার সম্ভাবনা নাই। প্রজাপতি প্রথম কীট অবস্থায় থাকে, পরে পতঙ্গত্ব প্রাপ্ত হয়, সেই কীট হইতে যে সুন্দর পতঙ্গ বাহির হয়, ইহা যিনি কখনও দেখেন নাই, তাহার পক্ষে সেই কীট দেখিয়া সে কীট পতঙ্গ হইবে না এই কথা বলা যেমন, পূর্বোক্ত যুক্তিও সেই প্রকার।
- ২.↑প্রতিপক্ষ দিগের যুক্তি এই—জগতের সকল বস্তুই কালে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়, সুন্দর ফুলটী প্রস্ফুটিত হইল, ২/১ দিনের জন্য শোভা বিস্তার করিল, দুই দিন লোকের মন হরণ করিল, পরে আপনা আপনি বিলীন হইয়া গেল। সকল বস্তুই যখন কালে বিলীন হয়, তখন মানবের পক্ষে সে নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিবে কেন? সাদৃশ্যে বিচার করিতে গেলে বরং ইহাই বলা যুক্তি যুক্ত বোধ হয় যে, মানবের শরীর ধ্বংস হইলে আর কিছু থাকিবে না। ইহার উত্তরে বক্তব্য এই যে, দশটী স্থানে একটা ঘটনা ঘটে বলিয়া যে একাদশটী স্থলে তাহাই ঘটিবে তাহা কে বলিল? যদি উক্ত উভয় বস্তু স্বজাতীয় বা স্ব ধর্ম্মাবলম্বী হয়, তাহা হইলেও একদিন এইরূপ অনুমান সম্ভবপর হইতে পারে। কিন্তু প্রকৃতি ও পুরুষের ন্যায় বিভিন্ন ধর্ম্মাবলম্বী পদার্থের প্রতি সাদৃশ মূলক যুক্তি সম্পূর্ণ রূপে খাটে না। মনে করুন, এক ব্যক্তি অদ্যাবধি যত তরু দেখিয়াছেন, সকল স্থানেই দেখিতে পাইয়াছেন, এক ফল পাকিয়া গেলে আবার ফল জন্মে; তিনি যদি একটা কদলি বৃক্ষ বা ধান্য বৃক্ষ দেখিয়া বলেন যে, ইহাতে যে ফল ধরিয়াছে, তাহা পাকিয়া গেলে আবার ফল ধরিবে; তখন কি আমরা তাহাকে এই কথা বলি না যে, তুমি ২০০ শত স্থানে এক ফল পাকিতে, আর এক ফল ধরিতে দেখিয়াছ; তথাপি এই সকল তরু সে শ্রেণীভুক্ত নয়। ইহাদের একবার ফল পাকিলে আর সে বৃক্ষে ফল ধরে না। সেইরূপ পুষ্পাদির উল্লেখ করিয়া যিনি সদৃশ বিচার করেন, তাহাকে কি এই কথা বলা যায় না যে, তুমি যাহা বলিতেছ, পুষ্পাদির পক্ষে তাহা নিয়ম, মানবাত্মার পক্ষে সে নিয়ম নয়।
- ৩.↑
প্রকৃতির মূলে গেলেই দেখিতে পাইবে যে, জীবন তৃষ্ণার মধ্যে দুই প্রকার ভাব আছে। প্রথমতঃ বর্ত্তমান জীবনের প্রতি অনুরাগ বা শ্রদ্ধার অভাব এবং ভাবী জীবনের জন্য আশা ও বাসনা। এমন লোক প্রায় সৃষ্ট হয় না, যে আপনার বর্ত্তমান অবস্থার প্রতি সন্তুষ্ট। তোমার হৃদয় মনের অবস্থা যেরূপ রহিয়াছে, তোমার সুখ দুঃখের পরিমাণ ও সেরূপ রহিয়াছে। তোমার এখানকার জীবন যাহা—তাহাতে তোমার চিত্তের সন্তোষ আছে কিনা, এই প্রশ্ন করিলেই সকলে বলিলেন, না, তবে বাঁচিয়া থাকিবার ইচ্ছা কর কেন? তবে জীবনকে প্রার্থনীয় জ্ঞান কর কেন? এ প্রশ্নের উত্তরে সকলেই বলিবেন, বর্ত্তমান জীবনের জন্য জীবনকে প্রার্থনীয় জ্ঞান করি না। কিন্তু ভবিষ্যতের আশাতেই তাহাকে প্রার্থনীয় মনে করি। এখানে দেখা যাইতেছে যে, আমাদের যে জীবন-তৃষ্ণা আছে, তাহার মূলে উক্ত উভয় ভাব আছে। সুতরাং জগতে যে জীবন যাপন করি, তদ্বারা সে তৃষ্ণা নিবারণ হইতেছে না; তাহার নিবৃত্তির নিমিত্ত অবচ্ছিন্ন জীবন ধারণের প্রয়োজন।
পরকালে বিশ্বাস স্থাপনের অন্যতম কারণ এই যে, মানবের মনে নিজ আত্মার সুখ বিকাশ ও উন্নতির একটা আদর্শ আছে। যে আদর্শ সর্ব্বদা হৃদয়ে জাগ্রত থাকাতেই আমাদের বর্ত্তমান জীবনের প্রতি শ্রদ্ধার উদয় হয়। আমরা কি চাই, এ জ্ঞান না থাকিলে ইহা চাই না একথা বলা সম্ভব নয়। মানবের জীবন উন্নতি ও মহত্ব বিষয়ে আমাদের যে আদর্শ আছে, পরকাল না থাকিলে সে আদর্শ পূর্ণ হয় না। যদি একটা কাগজে কোন একটী অক্ষর লিখিয়া তাহার অর্দ্ধেক এমতভাবে ছিন্ন করা যায় যে, উক্ত অক্ষরটায় অর্দ্ধেক একখণ্ডে এবং অপরাদ্ধ অপর খণ্ডে থাকে, তৎপর যদি তাহার একখণ্ড কাগজ কাহাকেও দেখান যায়, সে তৎক্ষণাৎ বলিয়া উঠিবে, ইহার আর একখণ্ড আছে। কারণ তদ্ভিন্ন অক্ষরটা পূর্ণ হয় না। এখানে দেখা যাইতেছে যে, পূর্ণ অক্ষরটীর ভাব মনে থাকাতেই আর এক খণ্ডের চিন্তা হৃদয়ে উদিত হইতেছে। সেইরূপ মানব জীবনের পূর্ণতার একটা আদর্শ মনে থাকাতে, পরকালের চিন্তা আপনা আপনি মনে হয়। মৃত বাবু কেশবচন্দ্র সেন কাগজের এই দৃষ্টান্তটী এক সময় প্রদর্শন করিয়াছিলেন।
- ৪.↑পরমেশ্বর মনুষ্যকে স্বাধীনতা না দিলে, মনুষের পক্ষে ধৰ্ম্ম অসম্ভব হইত। ধৰ্ম্ম লাভ করিতে পারে ইহাই মনুষ্যের সর্বোচ্চ গৌরব। স্বাধীনতাই ধর্ম্মের জীবন। যে নারী চিরকাল লৌহময় গৃহে কঠিন নিগড়ে বন্ধ, তাহাকে সতী বলিয়া কি কোন প্রশংসা করিতে পারে? যেখানে পাপ করিবার ক্ষমতা নাই, সেখানে ধর্ম্মোপার্জ্জনও অসম্ভব। পক্ষাঘাত রোগে যাহার হস্ত পদ অবশ, তাহাকে কি কেহ কখন নিরুপদ্রবকারী বলিয়া কাহাকে আঘাত করেন না বলিয়া প্রশংসা করিতে পারে? স্বাধীনতা আছে বলিয়াই মানুষের গৌরব, যদি স্বাধীনতা না থাকিত, তবে মনুষ্য কোন সৎকাৰ্য্য করিলেও মানুষের কাৰ্য্য বলিয়া তাহার কোন মূল্য থাকিত না। বিপরীত পথে চলিবার শক্তি আছে বলিয়াই মানুষ সৎপথে চলিলে তাহার প্রশংসা ও গৌরব। গ্রহের কক্ষের ন্যায় যদি মানব জীবনের একই নির্দ্দিষ্ট পথ থাকিত ও উহা হইতে বিচ্যুত হওয়া ঐশিক নিয়মানুসারে সম্ভব হইত, তাহা হইলে মানবের কাৰ্য্যে নিন্দা বা প্রশংসা, দোষ বা গৌরব বা হীনতা, ধর্ম্ম বা অধর্ম্মাবস্থা থাকিত না।
- ৫.↑পৃথিবীর সম্রাট মধ্যবর্ত্তী ব্যতীত প্রজার সহিত সাক্ষাৎ সম্বন্ধে কোন কাৰ্য্য করেন না। মন্ত্রী এবং সেক্রেটরীর যোগে কাৰ্য্য চলিয়া থাকে।