মন্থরাহরণ

এক

প্রভাতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়

অযোধ্যাধিপতি প্রজারঞ্জক রাজাধিরাজ রামচন্দ্র যেদিন পুণ্যসলিলা সরযু নদীতে আত্মবিসর্জনপূর্বক পার্থিব দেহ ত্যাগ করিলেন এবং তাঁহার অভিন্নহৃদয় মহাযশা অনুজদ্বয়,—ভরত ও শত্রুঘ্ন,—তাঁহাকে অনুসরণ করিয়া মর্ত্যলোক হইতে বিদায়গ্রহণ করিলেন, সেদিন মহানগরী অযোধ্যার এবং নগরোপকণ্ঠস্থিত নন্দিগ্রাম প্রভৃতি গ্রামাঞ্চলের আবালবৃদ্ধবনিতা জনগণ সেই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখিবার জন্য দলে দলে নগরসীমান্তে, নদীতীরস্থ বিশাল প্রান্তরে সমবেত হইয়াছিল। সেই সাগরসদৃশী মহতী জনতার মধ্যে ইতস্ততঃ গো এবং অশ্বযোজিত উত্তুঙ্গধ্বজশোভিত বিচিত্র রথসমূহ এবং মেরু পর্বততুল্য মহাকায় গজসমূহ দৃষ্ট হইতেছিল। সমুদ্রমধ্যস্থ দ্বীপের ন্যায় সেই সকল যানবাহনের উচ্চ মঞ্চে আসীন বা দণ্ডায়মান হইয়া যাঁহারা সেদিন রামতিরোধান দৃশ্য দেখিবার সৌভাগ্য লাভ করিয়াছিলেন তাঁহারা – অর্থাৎ সামন্তরাজগণ, রাজপুরুষ ও ধনিবৃন্দ, – সকলেই সকরুণ নেত্রে নদীর দিকে চাহিয়া আপনাদিগের অদৃষ্টকে ধিক্কার দিতেছিলেন। তদ্ভিন্ন ভূমিতলে দণ্ডায়মান এবং প্রাস্তরপার্শ্বস্থ প্রাসাদ ও বৃক্ষশ্রেণীর শীর্ষদেশে অবস্থিত লক্ষ লক্ষ পুরবাসী—নীরবে অশ্রুমোচন করিতেছিল। বিজয়, মধুমত্ত, মঙ্গল, সুমাগধ প্রভৃতি শ্রীরামচন্দ্রের বিশেষ স্নেহভাজন পারিষদবৃন্দ প্রভুবিরহিত জীবন অসহ্য বিবেচনা করিয়া নিজ নিজ আত্মীয়গণের নিকট বিদায় লইয়া একে একে সলিলপ্রবেশ করিলেন। ছত্রধারিণী সুসঙ্গতা, তাম্বুলকরঙ্কবাহিনী বাসবী, বেত্রবতী বসুধারা প্রভৃতি নৃপতির একান্ত অনুগতা অনুচরীবৃন্দ এবং সারথি সুমন্ত্র, দৌবারিক অরিন্দম, অঙ্গসংবাহক সোমসূত, সূপকার শীতল প্রভৃতি রামগতপ্রাণ অনুচরগণও স্ব স্ব গলদেশে রজ্জুবন্ধ কলস লম্বিত করিয়া অকম্পিতপদে তাঁহাদিগকে অনুসরণ করিল। মাতৃগণ পূর্বেই গতাসু হইয়াছিলেন, বর্ষীয়সী দশরথপত্নী যে কয়জন তখনও জীবিতা ছিলেন তাঁহারা ঊর্মিলা, মাণ্ডবী, শ্রুতকীর্তি প্রভৃতি রাজকুলবধূদিগের সহিত রথতলধূল্যবলুণ্ঠিতা হইয়া কাঁদিতে লাগিলেন। তদ্দর্শনে অযোধ্যার পুরনারী এবং পার্শ্ববর্তী জনপদবাসিনীদিগের মধ্যেও তুমুল ক্রন্দন-কোলাহল উত্থিত হইল। লোকনয়নাভিরাম কমললোচন রামচন্দ্রের নদীমধ্যে অন্তর্ধানের সঙ্গে সঙ্গে সরযুর উভয়তীর হইতে শত শত নরনারী উন্মত্তের মতো নদীজলে লম্ফপ্রদান করিয়াছিল, তাহাদের মধ্যে অনেকেই আর উঠে নাই। কেবল ভীরু এবং অব্যবস্থিতচিত্ত কয়েক ব্যক্তি অল্পক্ষণে পর্যুদস্ত হইয়া অর্থাৎ জলে হাবুডুবু খাইয়া তীরে ফিরিয়া আসিয়াছিল। সেই সুবিপুল জনসমাবেশের মধ্যে সকলেই যে সেদিন নিঃস্বার্থ স্নেহবশে শোকজ্ঞাপন করিতে আসিয়াছিল তাহা বলা যায় না। কতিপয় মোদক প্রভৃতি মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী আপূপিক বিবিধজাতীয় ক্ষীরনারিকেলগর্ভ লড্ডুক, ক্ষৈরেয় ও আমিক্ষীয় অর্থাৎ ছানার দ্বারা প্রস্তুত মিষ্টান্ন দধি, পিষ্টক, তৈলভর্জিত পর্পটিকা, তুষার-শীতলিত মধুর পানীয় প্রভৃতি বিক্রয় করিয়া সেদিন বহু দূরাগত ক্ষুৎপিপাসাতুর ব্যক্তির ক্ষুধাতৃষ্ণা নিবারণপূর্বক যুগপৎ ধর্ম ও অর্থসঞ্চয় করিয়াছিল। অনেক লঘুহস্ত চতুর ব্যক্তি অসতর্ক দর্শকদিগের গ্রন্থিচ্ছেদন দ্বারা এবং অনেকে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হারকুণ্ডলপাদুকাদি সংগ্রহ-দ্বারা লাভবান্ হইয়াছিল। তদপেক্ষা চতুর মজ্জনাসম্ভরণাভিজ্ঞ কয়েকব্যক্তি সরযুজলতলে সন্তরণ করিয়া বহু সলিল নিমজ্জিত নরনারীর বস্ত্রালঙ্কার হরণপূর্বক ঘটনাস্থল হইতে বহুদূরে গিয়া তীরে উঠিয়াছিল এবং যথাকালে ও যথাস্থানে শ্রীরামচন্দ্রের কেয়ূর, শত্রুঘ্নের কটিনিবদ্ধ কৃপাণ, ভরতের মণিহার প্রভৃতি বিক্রয় করিয়া অবশিষ্ট জীবন সুখে অতিবাহনের ব্যবস্থা করিয়া লইয়াছিল। সন্ধ্যার অন্ধকারে বহুক্ষণ অপেক্ষা করিয়া এখন আর কাহারও স্বেচ্ছামৃত্যু দেখিতে পাইবার সম্ভাবনা রহিল না তখন নগরবাসী অধিকাংশ নরনারী সাশ্রুনয়নে গৃহে ফিরিল। পল্লীবাসী ও বাসিনীরাও তাহাদের শূন্য দধিভাণ্ডশক্ত কলসাদি মস্তকে ধারণপূর্বক, কেহ আত্মীয় প্রতিবাসীদের নাম ধরিয়া হুক্কার-হিক্কার করিতে করিতে, কেহ বিভিন্ন ব্যক্তির অবিবেচনার জন্য নিন্দাবাদ করিতে করিতে, কেহ বা পুত্ৰ-কন্যা বা পত্নী হারাইয়া তারস্বরে রোদন করিতে করিতে গ্রামাভিমুখে যাত্রা করিল। কেবল কয়েকজন তপস্বী ধ্যানধারণার্থ নির্জন নদীসৈকতে নীরবে বসিয়া রহিলেন; রাত্রি এক প্রহরের মধ্যেই ঘটনাস্থল প্রায় জনশূন্য হইয়া গেল।

সেদিন যে অল্প কয়েকজন ব্যক্তি শোকবশে মোহগ্রস্ত না হইয়া নির্মম চিত্তে নিজ নিজ কর্তব্যসম্পাদনে রত ছিলেন তন্মধ্যে ইক্ষ্বাকুবংশের কুলপুরোহিত মহর্ষি বসিষ্ঠ বহু পূর্বেই কুশ-লব, এবং অন্যান্য রাজান্তঃপুরিকাদিগের অবসন্ন দেহ বিভিন্ন শিবিকা দোলা বা রথে স্থাপন করিয়া স্থানত্যাগ করিয়াছিলেন, মহর্ষি জাবালি সমাগত সামন্ত নৃপতি, অবশিষ্ট রাজসভাসদ ও মুনিগণকে নানাপ্রকারে সান্ত্বনাদানপূর্বক গৃহে ফিরাইয়া লইয়া গিয়াছিলেন; কেবল ভবিষ্যতে-‘দুমুর্খ’ নামে অভিহিত সভাসদ্ ভদ্র শেষ পর্যন্ত যতদূর সম্ভব সেই বিশাল জনসমাবেশের মধ্যে শৃঙ্খলা বিধানের জন্য সানুচর সচেষ্ট ছিলেন। অনেকগুলি দলভ্রষ্ট জনাপদ নারী ও শিশুকে আত্মীয়হস্তে এবং কতিপয় দুর্বৃত্তকে রাজপুরুষদের হস্তে সমর্পণ করিয়া তিনি সেদিন বহুজনের আশীর্বাদ এবং অল্প কয়েকজনের শাপভাজন হইয়াছিলেন। সর্বশেষে কয়েকটি আত্মীয়দলচ্যুত রোরুদ্যমান শিশুর ভার নগরপাল বসুদত্তের হস্তে সমর্পণ করিয়া তিনি অল্প কয়েকজন প্রতিবেশীর সঙ্গে স্বগৃহাভিমুখে যাত্রা করিলেন। পথের উভয়পার্শ্বে বিভিন্ন গৃহ হইতে তখনও মৃদু রোদনশব্দ শ্রুত হইতেছিল। নির্বাক্ ও নিরশ্রুনয়ন অমাত্য ভদ্রকে দেখিয়া তাঁহার অন্তরে যে কী শোকানল জ্বলিতেছিল তাহা বুঝিবার উপায় ছিল না। মশালালোকে তাঁহাকে চিনিতে পারিয়া পথিমধ্যে কয়েকজন নগরবাসী, “ঐ সেই পাপিষ্ঠ ভদ্র” বলিয়া ধিক্কার দিল। জনৈকা পথচারিণী পুরমহিলা অবগুণ্ঠনের মধ্য হইতে মন্তব্য করিলেন, “আনদ্ধকুণ্ডীর পুত্রকে যমরাজ কি ভুলিয়া গিয়াছেন?” অপর কোনো দয়াবতী বলিলেন, “মাতা জানকীর যত দুঃখের মূল এই দগ্ধমুখকে কেহ গলদেশে প্রস্তর বাঁধিয়া নদীতে নিক্ষেপ করিল না কেন?” সঙ্গিনী বলিলেন, “আহা, তাহা হইলে যে সরযু, শুখাইয়া যাইত।” আর একজন আশ্বাস দিলেন, “যমরাজ নূতন নরক নির্মাণ করিতেছেন, শেষ হইলেই উহার ডাক পড়িবে। চিন্তা কি?”

মশালালোকে পথ দেখাইয়া যে প্রতিবেশীরা অগ্রে চলিতেছেন তাহারা একে একে স্ব স্ব গৃহে প্রবিষ্ট হইলে ভদ্র অন্ধকারে নিজ গৃহের দ্বারদেশে পৌঁছিয়া দেখিলেন কপাট রুদ্ধ রহিয়াছে। বারংবার করাঘাত করিলেন, পত্নী, দাসী এবং পুত্রের নাম ধরিয়া ডাকিলেন। প্রায় দুই দণ্ড কাল অপেক্ষার পরেও যখন কেহ দ্বার খুলিল না তখন ভদ্র বুঝিলেন, তাঁহাকে আর সেই গৃহে প্রবেশ করিতে দেওয়া পত্নী সুতপার ইচ্ছা নহে, সেইজন্যই দ্বার উদ্ঘাটিত হইতেছে না। তাঁহাকে সীতানির্বাসনের কারণস্বরূপ জানিয়া বাড়ির লোকেরাও ঘৃণা করিত, ইতঃপূর্বে অনেকদিন অনেক কঠোর কথা সেজন্য তাঁহাকে পত্নীর মুখে শুনিতে হইয়াছে, কিন্তু নিজ গৃহপ্রবেশে বাধাপ্রাপ্তি এই তাঁহার প্রথম। শোকে, ক্রোধে সুতপার মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটিয়াছে, এখন তাঁহার শান্তির ব্যাঘাত না ঘটাইয়া পথে রাত্রিযাপনই শ্রেয়স্কর বিবেচনায় ভদ্র রাজমার্গে অবতরণ করিলেন। রাজাজ্ঞায় নিশীথভ্রমণে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন, কিন্তু অদ্য অবস্থাটা একটু অন্যরূপ। বাহিরের অন্ধকারের সহিত অন্তরের শোক ও অপমানের অন্ধকার মিশিয়া যেন পদে পদে তাঁহার পথরোধ করিতে লাগিল। পথের দুইপার্শ্বে আপণশ্রেণীর দ্বার অর্গলাবদ্ধ, এখানে-ওখানে দুই-চারি জন নগরবাসী নিজ নিজ গৃহদ্বারে বা দীপহীন অলিন্দে বসিয়া নিম্নস্বরে রামকথা আলোচনা করিতেছে। সীতাপবাদে রামনিন্দা শুনিয়া একসময়ে রামভক্ত অমাত্যের কর্ণকুহর ক্ষোভে জ্বলিয়া যাইত; তাঁহার অপরাধ, তিনি সে-কথা প্রভুর কল্যাণকামনায় তাঁহার শ্রুতিগোচর করিয়াছিলেন। আজ পথে পথে সতীসীমন্তিনী সীতা দেবীর এবং আদর্শ নৃপতি রামচন্দ্রের ভূয়সী প্রশংসা তাঁহার কর্ণে মধুবর্ষণ এবং অন্তরে কৌতুক সঞ্চার করিতে লাগিল। একদা এই অব্যবস্থিতচিত্তদের প্রশংসালাভের জন্য তিনি শ্রীরামচন্দ্রকে সীতানির্বাসনে প্ররোচিত করিয়াছিলেন বলিয়া তাঁহার নিজের প্রতিও এতদিন পরে ধিক্কার জন্মিল। অল্পক্ষণ পরেই চারিদিক নিঃশব্দ হইয়া গেল, পথে আর দ্বিতীয় পথিক দৃষ্ট হইল না।

সেদিন রাত্রিতে দ্বাদশযোজনায়তা মহানগরী অযোধ্যার কোনও গৃহে প্রদীপ জ্বলে নাই। বিচিত্র কারুকার্যমণ্ডিত কবাটতোরণান্বিত শতসহস্র বহুভূমিক অট্টালক এবং সুবিশাল শিখর সমন্বিত স্বর্ণচূড় মন্দিরসমূহ অন্ধকারে নিঃশব্দ নির্জন গিরিশ্রেণীর মতো পথে পথে দণ্ডায়মান ছিল। সে-রাত্রিতে নগরীর শত শত নাট্যশালার একটিতেও নৃত্যগীত হয় নাই, এমন কি কোনও দেবমন্দিরে শঙ্খঘণ্টা বাজাইয়া সন্ধ্যারতি পর্যন্ত হয় নাই। শোকাচ্ছন্ন নগরীর বায়ু সে-রাত্রে চন্দন, অগুরু ও পুষ্প গন্ধহীন; জনহীন পথে বিড়ালেরা সঞ্চরণ করিতেছে, কদাচিৎ কোনও পেচকের কর্কশ কণ্ঠধ্বনি শ্রুত হইতেছে। যে বিদগ্ধ নাগরিক এবং নাগরিকারা অন্যদিন গৃহশীর্ষে বীণাবেণুমৃদঙ্গমন্দিরারবের সহিত আপনাদের সুকণ্ঠধ্বনি মিলাইয়া নৈশাকাশ মুখরিত করিয়া রাখিত, আজ তাহারা শোকে মোহ্যমান, অথবা দিবসের উত্তেজনার ক্লান্তিতে উপস্থিত সুখসুপ্তির প্রসাদে নীরব। উদ্দেশ্যহীন ভাবে পাদচারণ করিতে করিতে অমাত্যপ্রবর ভদ্র রাজপ্রাসাদাবলীর সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। সেখানে মহাপথের উভয় পার্শ্বে নিবিড় কালিমায় আবৃত শাল, তমাল, চন্দন, চম্পক, পুন্নাগ, কর্ণিকার প্রভৃতি বৃক্ষবীথিকাশোভিত সুবিস্তীর্ণ উদ্যানমধ্যে রাজা এবং রাজপরিবারভুক্ত ব্যক্তিগণের অত্যুচ্চ এবং বিবিধ-ভাস্কর্য-ও-অলঙ্করণে-সমৃদ্ধ-সৌধরাজি বিকীর্ণমৃধজা বিধবার মতো নিঃশব্দ হাহাকারে আকাশ আচ্ছন্ন করিতেছিল। সেই উচ্চাবচ পুররাজির মধ্যে সর্বোচ্চ ও বিশালতম সৌধ রামভবনের সমীপবর্তী হইয়া ভদ্র বিস্মিত হইলেন। দেখিলেন, তোরণদ্বার উন্মুক্ত, অথচ দ্বারে কোনও প্রহরী নাই, নিকটে দূরে জনপ্রাণী নাই। অষ্টভূমিক মহাপুরীর শতাধিক কক্ষের মধ্যে একটিরও পাষাণজালায়নে আলোকরশ্মির চিহ্ন দৃষ্ট হইল না। কেবল একটি শ্বেতবসনা বৃদ্ধা নারীর ছায়ামূর্তি একবার যেন প্রাসাদের ত্রিতলের একটি বাতায়নে দেখা দিয়া মিলাইয়া গেল। সীতানির্বাসনের পর হইতে রামচন্দ্রের প্রাসাদে সন্ধ্যার পর রাজমাতৃগণ ভিন্ন অন্য কোনও স্ত্রীলোকের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। ভদ্র মনে করিলেন, দশরথের কোনও অন্তঃপুরিকা হয়তো রামবিয়োগদুঃখ অপনোদনের জন্য রামস্মৃতিবিজড়িত প্রাসাদে প্রবেশ করিয়াছেন। সহসা প্রাসাদশীর্ষে চন্দ্রোদয় হইল, তরল জ্যোৎস্নায় চারিদিক স্বপ্নময় হইয়া উঠিল, সৌধচূড়ার স্বর্ণকলসটি দ্বিতীয় চন্দ্রের মতো জ্বলিয়া উঠিল। সেইদিকে কিছুক্ষণ মুগ্ধদৃষ্টিতে চাহিয়া থাকিয়া অমাত্য নিজের কর্তব্য স্থির করিয়া লইলেন; প্রাসাদরক্ষার ভার এ-রাত্রির মতো তাহাকেই লইতে হইবে। দিবা দ্বিপ্রহর হইতে ভদ্রের কোনও আহার্য উদরস্থ হয় নাই, ক্ষুধার উদ্রেক হইয়াছিল; নিরূপায় অমাত্য কটিবন্ধের বন্ধন দৃঢ়তর করিয়া আপাততঃ তাহাকে দমিত করিলেন। রাজভবনের সম্মুখস্থ পথের অপর পার্শ্বে তরুবীথিকার ছায়ায় কোষবদ্ধ তরবারি ভূতলে রাখিয়া তিনি রাত্রিযাপন করিতে বসিলেন, ক্লান্তদেহে পাছে নিদ্ৰাবিষ্ট হন, সেই ভয়ে শয়ন করিলেন না।

সভাসদ ভদ্রের দৃষ্টিগোচর না হইলেও সেদিন সেই অন্ধকার রাজপুরীতে সেই সময়ে মানুষের অভাব ছিল না। তোরণদ্বারের উভয় পার্শ্বে প্রহরীদের দ্বারকোষ্ঠসমূহে শতাধিক প্রহরী দীর্ঘকাল রোদনের পর অবসন্ন হইয়া অথবা শোকাপনোদনের জন্য মাধ্বী, গৌড়ী, তাড়ী প্রভৃতি সুরাপান করিয়া নিদ্রাদেবীর ক্রোড়ে আশ্রয় লইয়াছিল। পিতৃবিয়োগকাতর কুশ এবং লব সর তীর সরযুতীর হইতে অনিচ্ছাসত্ত্বেও পিতৃনির্দেশে প্রজাপালনের গুরুদায়িত্ব লইয়া গৃহে ফিরিয়া অভুক্ত অবস্থায় প্রাসাদের সপ্ততলে তাঁহাদের নিজ নিজ শয়নকক্ষের দ্বার রুদ্ধ করিয়াছিলেন। ঊর্মিলা, মাণ্ডবী ও শ্রুতকীর্তি নিজ নিজ প্রাসাদে গিয়া দুঃসহ শোকে ধুল্যবণ্ঠিত হইতেছিলেন, রামতনয়দিগকে সান্ত্বনাদানের শক্তিও তাঁহাদের ছিল না। রামভবনের অন্যান্য তলে বিভিন্ন কক্ষে রামের আশ্রিত শত শত পৌরজন এবং পোষ্য আত্মীয় কুটুম্ব রামের শোকে এবং নিজেদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় অশ্রুমোচন করিতে করিতে অকালে নিদ্রাগত হইয়াছিলেন। রন্ধনশালায় সূপকারেরা রন্ধন করে নাই, ভোজনশালায় কিঙ্করগণ অন্নপাত্র ও আসন দেয় নাই, সুতরাং সকলকেই সে রাত্রে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অভুক্ত থাকিতে হইয়াছিল। কেবল কয়েকটি ক্ষুধাতুর বৃদ্ধ গোপনেসঞ্চিত লড্ডুক, শক্তু, বা চিপিটক দুই-এক গ্রাস খাইয়া কোনও মতে পিত্তরক্ষা করিয়াছিলেন। উপস্থিত সকলেই যথোচিত শয্যায় শায়িত এবং নিদ্রাগত। নিঃসঙ্গ প্রেতের মতো কেবল দুইটি সঞ্চরমান মনুষ্যদেহী সেই সময়ে সেই বিশাল প্রাসাদে সম্পূর্ণ সজাগ এবং স্ব স্ব স্বার্থসাধনে সচেষ্ট ছিল। একজন দশরথমহিষী কৈকেয়ীর কেকয়দেশীয়া কুখ্যাতা পরিচারিকা মন্থরা, আর একজন রাজানুগৃহীত স্বর্ণকার এবং কোশলরাজ্যের প্রখ্যাত শিল্পী বিশাখদত্ত। একজন সম্মুখের পথে এবং অপরজন উদ্যানমধ্যস্থ গুপ্তপথে পুরী প্রবেশ করিয়াছিল, তাই বহুক্ষণ পর্যন্ত তাহারা কেহ কাহারও নয়নপথবর্তী হয় নাই, তবে তাহাদের কাহারও উদ্দেশ্যই যে সাধু ছিল না, তাহা বলা নিষ্প্রয়োজন। সেদিন অযোধ্যায় লক্ষ লক্ষ পুরবাসীর মধ্যে এই দুইজন কেবল সরযুতীরে না গিয়া রাত্রির দুঃসাহসিক অভিযানের জন্য শক্তি সঞ্চিত করিয়া রাখিয়াছিল।

শৈশবে পঞ্চনদপ্রদেশের জলবায়ুতে বর্ধিতা হওয়ায় মন্থরার শরীরে এখনও শক্তি ছিল, দণ্ডের সাহায্য-ভিন্নই সে চলিতে ফিরিতে এবং সোপান আরোহণ ও অবরোহণ করিতে পারিত; কিন্তু তাহার কুব্জ সমন্বিত-ন্যুব্জদেহ জরার ভারে আরও ন্যুব্জ হইয়া পড়িয়াছিল, স্বভাবকুৎসিত মুখ বলিরেখান্বিত এবং শীর্ণ হইয়া আরও বীভৎস দেখাইতেছিল। শেষ বয়সে করুণাময় রামচন্দ্রের দয়ায় তাহার অভাব বলিতে কিছুই ছিল না, কৈকেয়ী দেবীর দেহান্তের পর কাজ বলিতেও কিছু ছিল না। রাজযোগ্য আহার্য পানীয়, দুগ্ধফেননিভ শয্যা, সুসজ্জিত বাসকক্ষ ভিন্ন, পরিচর্যার জন্য একজন সেবাদাসীর ব্যবস্থাও তাহার জন্য হইয়াছিল, তথাপি তাহার মনে একদিনের জন্যও শান্তি আসে নাই। অনুতাপ? মন্থরা অনুতাপ করিবে কিসের দুঃখে? সে যাহাদের ভালবাসিয়াছিল, যাহাদের কল্যাণ চাহিয়াছিল,—তাহারা তাহার সুপরামর্শের মূল্য বুঝিল না, করতলগত রাজৈশ্বর্য কাজে লাগাইল না, — সেজন্য, সে অনুতাপ করিবে কেন? যে-যাহার কর্মফল ভোগ করিয়াছে, তাহার কী দোষ? সীতা অলোকসামান্য রূপ লইয়া চিরদুঃখিনী হইয়াছেন, তবু তিনি রামের মতো স্বামীর একনিষ্ঠ প্রেম পাইয়াছিলেন, যত অল্পদিনের জন্যই হউক তাঁহাকে লইয়া ঘর করিবার সুযোগ পাইয়াছিলেন। আর মন্থরা? অলোকসামান্য কুরূপ লইয়া সে চিরদুঃখিনী হইয়াছে। দাসীর কন্যা দাসী, আযৌবন পুরুষের প্রেমে বঞ্চিতা; সকলের ঘৃণা ভিন্ন সে যে জীবনে কিছুই পাইল না! একজনের জন্য দেশশুদ্ধ লোক হাহাকার করিতেছে, আর একজন মন্দভাগিনীর দুঃখের কথা কেই ভাবিয়াও দেখে না! এই তো সংসারের বিচার! মূর্খা কৈকেয়ী, মূর্খ ভরত, ততোধিক মূর্খ রাম। অজ্ঞ মূঢ় কয়েকটা প্রজার নিন্দানিঃসারিণী রসনা ছিন্ন না করিয়া তাহাদের মনোরঞ্জনের জন্য সাধ্বী সুন্দরী স্ত্রীকে বনে বিসর্জন দিয়া তাহার বিরহে শেষজীবনটায় কী কষ্টটাই না পাইল! তা’ও বলি, নির্বাসন দিয়াছিলি তো দিয়াছিলি, ব্রহ্মচারী হইয়া দিন কাটাইবার কী প্রয়োজন ছিল? রাজচক্রবর্তী রাজার কখনও সুন্দরী স্ত্রীলোকের অভাব হয়? পিতার কোনও গুণই ছেলেটা পাইল না, কেবল তাহার অন্তঃপুরের ছাগী-শূকরীর পাল পুষিয়াই মরিল। যাক্ মন্থরার মনস্কামনা পূর্ণ হইয়াছে, উহারা সকলেই মরিয়াছে। সেজন্য সে দুঃখিতা নহে, সে আর কাহাকেও চাহে না। যে ভরতকে সে ক্রোড়ে-পৃষ্ঠে করিয়া মানুষ করিয়াছে, যাহার উন্নতির জন্য সে অবিনশ্বর দুর্নাম কিনিয়াছে, সে ইদানীং পথে দেখা হইলে কথা কহিত না, পাশ কাটাইয়া যাইত। শত্রুঘ্ন তাহাকে যে অপমান করিয়াছিল সে জীবনে বিস্মৃত হওয়া যায় না, মন্থরা আজও ভুলিতে পারে নাই। কৈকেয়ী তাহার বুদ্ধিতে চলিয়াই একদিন মূঢ় দশরথকে করায়ত্ত করিয়াছিল, কৌশল্যাদি সপত্নীগণকে যথোচিত অপমান করিয়া পদতলে রাখিয়াছিল, শেষ পর্যন্ত তাহারই পরামর্শে স্বামীর মৃত্যুর কারণ হইয়াছিল। আবার পুত্রের ভর্ৎসনায় সহসা তাহার মতিপরিবর্তন হইল, একরাত্রে ডিগবাজী খাইয়া যে সাধ্বী সাজিয়া বসিল, কৌশল্যার এবং রামের চরণে দাসখত লিখিয়া দিল। ইদানীং সেও, — তাহার কন্যার বয়সী কন্যাসমা প্রভুনন্দিনীও—তাহার সহিত বাক্যালাপ করিত না, এক প্রাসাদে থাকিয়াও কেশরচনা ও অঙ্গ স্পর্শ করিতে দিত না। ইহাকেই বলে, যাহার জন্য করি চুরি সেই বলে তস্কর! মন্থরার মায়া-স্নেহ-মমতা সবই একদিন ছিল, বড়ো বেশী ছিল বলিয়াই সেগুলা ছিড়িয়া উপড়াইয়া ফেলিতে বড়ো বেশী কষ্ট হইয়াছে; বুকের মধ্যে তাহার জ্বালা যেন জুড়াইতে চাহে না। আজ ঘৃণা ছাড়া আর কিছু নাই। রঘুবংশের উপর, কেকয়রাজ অশ্বপতির বংশের উপর, মানবসমাজের উপর,—বিশ্বের উপর, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা যদি কেহ কোথাও থাকেন তবে তাঁহার উপর তীব্র বিদ্বেষ ভিন্ন মন্থরার অন্তরে আজ আর কিছু নাই। যাঃ, নিশ্চিন্ত! রাম নাই, ভরত নাই, অন্তঃপুরের প্রবেশপথে প্রাসকার্মুক ও বিবিধ শস্ত্রধারী প্রহরিগণ এবং বিভিন্ন কক্ষদ্বারে কাষায়বসন পরিহিত বেত্রধারী রামের অন্তঃপুররক্ষকগণ নাই। সর্বত্র মৃত্যুর নিস্তব্ধতা, সর্বত্র চরম বিশৃঙ্খলা। প্রাসাদেরও কি আজ রাত্রে এই অবস্থা? একবার দেখিয়া আসিলে হয় না? ক্ষমার অবতার রামচন্দ্রের কিছু ঋণ শোধ করিয়া আসিলে হয় না? ত্রিতলের বিরাট চিত্রশালাটি মনে পড়িল, রামের শয়নকক্ষে যাইবার পথে সেখানে ঘরে ঘরে কত ছবি, কত মূর্তি। মাঝের একখানি প্রকাণ্ড কক্ষের চারিদিকের দেয়াল জুড়িয়া রামায়ণচিত্র। সেই ভিত্তিচিত্রখানির মধ্যে একটি অংশে ‘মন্থরার কুমন্ত্রণা’ বর্ণিত আছে। প্রথমে রাজ্যাভিষেকের কথা শুনিয়া কৈকেয়ী মন্থরাকে কণ্ঠ হইতে রত্নহার খুলিয়া দিতে যাইতেছেন, আর সে চক্ষু পাকাইয়া “মূঢ়ে” বলিয়া তর্জন করিতেছে, তারপর কৈকেয়ীর ভূমিশয্যায় রোদন, দশরথের বরদান। সমস্তই জীবন্তবৎ। ধূর্ত শিল্পী মন্থরার সেই বয়সের অবিকল প্রতিকৃতি আঁকিয়া তাহার কলঙ্ক অক্ষয় করিয়া রাখিয়াছে। সেই পাপ দূর করিবার আজই সুযোগ। এই পাপপুরী ত্যাগ করিবারও এমন সুযোগ আর হইবে না। একবার ভয় হইল, বৃদ্ধবয়সে এই নিরাপদ আশ্রয় ত্যাগ করিয়া কোথায় যাইবে, কোথায় দাঁড়াইবে? ভরতের পুত্রেরা তক্ষশিলায় এবং পুষ্কলাবতীতে তাহাকে আশ্রয় দিবে বলিয়া মনে হয় না, কেকয়েও তাহার স্থান হইবে না মনে হয়। তাহাতে কি হইয়াছে? তাহার বহু মণিরত্ন আছে, বহু স্বর্ণমুদ্রা সঞ্চিত আছে, তাহার সাহায্যে কোনো দূর দেশে কোনো নিভৃত গ্রামে একটি পর্ণকুটীর গড়িয়া এখনকার চেয়ে শান্তিতে থাকিতে পারিবে না? না পারে, না হয় মরিবে, সে মৃত্যু তাহার বর্তমান জীবনের চেয়ে গৌরবেরই হইবে। মনস্থির করিয়া মন্থরা সাজিতে বসিল, তাহার অলঙ্কারগুলির জন্য পেটিকা বহিয়া বেড়ানো অপেক্ষা সেগুলি শরীরে যেখানে যেটি ধরে পরিয়া লওয়াই যুক্তিযুক্ত মনে হইল। সে শুনিয়াছিল, রামরাজ্যে হিমালয় হইতে দক্ষিণ সমুদ্র পর্যন্ত কোনও সুন্দরী রত্নভূষিতা হইয়া একাকিনী ভ্রমণ করিলে কেহ তাহার অঙ্গ স্পর্শ করে না। আজ রামরাজত্বের শেষদিন, এখনই কিছু সে নিয়মের ব্যত্যয় হইবে না। বহুদিন পরে কক্ষদ্বার রুদ্ধ করিয়া মন্থরা সাজিতে বসিল। কেয়ূর, কঙ্কণ, মণিহার কুণ্ডল, কিরীট, নূপুর, চীনাংশুক,—পেটিকা খুলিয়া একটির পর একটি বাহির করিল। না, রামনির্বাসনের দিন কৈকেয়ী তাহাকে যে বিচিত্র বসনভূষণে সাজাইয়াছিলেন, কয়েকদিন পরেই শত্রুঘ্নের প্রহারে যেগুলি ছিন্নভিন্ন ও চূর্ণীকৃত হইয়াছিল, তাহার কিছুই আর ব্যবহারযোগ্য নাই। চৌদ্দবৎসর পরে রামবনিতা সীতাদেবী যখন স্বামীর সহিত অযোধ্যায় রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিতা হইলেন তখন দয়াময়ী ক্ষমাবর্তী তিনি স্বহস্তে মন্থরাকে এগুলি উপহার দিয়াছিলেন। এতদিন সে ঘৃণায় এগুলি স্পর্শ করে নাই, আজ প্রয়োজনবোধে একে একে প্রতিটি যথাস্থানে পরিল। অন্ধকারে প্রসাধন সমাপ্ত করিয়া সে অরণিঘর্ষণ দ্বারা প্রদীপ জ্বালিল, একখানি স্বর্ণদর্পণে মুহূর্তকাল নিজের ছায়া দেখিল। কী কুৎসিত দৃশ্য! ক্ষোভে লজ্জায় করধৃত দর্পণ মাটিতে আছড়াইয়া ফেলিয়া দীপ নিভাইয়া সে অনেকক্ষণ ভূমিতে লুটাইয়া কাঁদিল। শৈশবের যৌবনের বার্ধক্যের অনেক দুঃখ সঞ্চিত ছিল, অনেক ব্যথা অপমানের স্মৃতি,—রোদনের কারণ,—পুঞ্জীভূত হইয়া ছিল। মন্থরা কখনও লোকচক্ষুর সমক্ষে কাঁদিতে পারিত না, আত্মাভিমানে বাধিত। আজ তাহার পরিচারিকার অনুপস্থিতির সুযোগে রাজপুরীর নির্জন কক্ষে তাহার বহুদিনের অবরুদ্ধ অশ্রুস্রোত বাঁধ ভাঙ্গিয়া নামিল। পাষাণকুটিমে মাথা কুটিতে কুটিতে সে বলিতে লাগিল, “একবার যদি সুযোগ পাইতাম, দরিদ্রতম গৃহস্থের গৃহে একদিনের জন্য যদি পতিপুত্র লইয়া সংসার করিতে পারিতাম, তবে নারীজন্ম সার্থক হইত, পৃথিবীর লোক আমার অন্য মূর্তি দেখিত। দয়ায় ক্ষমায় প্রেমে আমি মর্তে স্বর্গ রচনা করিতাম।”

প্রায় দুইদণ্ডকাল কাঁদিয়া মন্থরা অশ্রুকলুষিত আরক্ত নয়ন মুছিয়া উঠিয়া বসিল, যাত্রার জন্য প্রস্তুত হইল। বাছিয়া বাছিয়া মূল্যবান্ মণিমুক্তাগুলি একটি থলিতে ভরিয়া আপন কঞ্চলিকার অভ্যন্তরে কুব্জের উপরে স্থাপন করিয়া কঞ্চলিকা আঁটিয়া পরিল, চিরদিনের সঞ্চিত স্বর্ণমুদ্রায় পূর্ণ আর একটি থলি কটিদেশ বেষ্টন করিয়া জড়াইয়া বাঁধিল। আবার দীপ জ্বালিল, দ্বীপ হইতে একটি উল্কা জ্বালাইয়া লইল। অতঃপর কৈকেয়ীভবনের ত্রিতল হইতে ধীরে ধীরে অবতরণ করিয়া দেখিল প্রহরীদের কক্ষে কেহ নাই, ভিত্তিগাত্র বিলম্বিত একটি লঘুভার পরশু খুলিয়া লইয়া সে উদ্যানপথে রামভবনের দিকে চলিল। কিছুদূর অন্তর প্রাচীর, প্রতি প্রাচীরে অন্তঃপুরিকাদের যাতায়াতের জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বার সংলগ্ন ছিল। মন্থরার নিকট কুঞ্চিকাগুচ্ছ থাকায় রামভবনে প্রবেশের পক্ষে তাহার কোনও অসুবিধা হইল না। সেখানে প্রশস্ত চত্বরে পৌঁছিয়া দেখিল জনপ্রাণী নাই। সে সোপান আরোহণ করিয়া ক্রমে ত্রিতলে উঠিল। কটিতে স্বর্ণভার, পৃষ্ঠে মণিরত্নভার, হস্তে পরশুর ভারও নগণ্য নহে, তথাপি মন্থরা কোনও ভারকেই ভার বলিয়া গ্রাহ্য করিল না, ঘরে ঘরে ঘুরিতে লাগিল। তখন আকাশে চন্দ্রোদয় হইয়াছে, রক্তপ্রস্তরনির্মিত জালায়নপথে শশাঙ্কের স্নিগ্ধরশ্মি গৃহভিত্তিতলে শতধারায় ছড়াইয়া পড়িয়াছে। মন্থরা হাসিল, প্রকৃতির কোনও দাক্ষিণ্যেই আজ তাহার মন ভুলিবে না, আজ সে প্রতিশোধ লইতে আসিয়াছে। আঘাতের পর আঘাতে ভিত্তিচিত্রের মন্থরা-কৈকেয়ী-সংবাদের চিত্র নিঃশেষে বিলুপ্ত করিয়াই তাহার তৃপ্তি হইল না, সে দশরথ এবং কৌশল্যার চিত্র যেখানে যতবার পাইল পরশুপ্রহারে ক্ষতবিক্ষত করিয়া উল্কাশিখা দ্বারা তাহাদের মুখমণ্ডল দগ্ধ করিয়া দিল। সীতাদেবীর এবং রামচন্দ্রের চিত্রেও মাঝে মাঝে সে কুঠারাঘাত করিল বটে কিন্তু, কি-জানি-কেন, তাঁহাদের মুখচ্ছবি বিকৃত করিতে আজিও তাহার হস্ত উঠিল না। সীতাহরণ চিত্রের সম্মুখে দাঁড়াইয়া একবার শুধু ভাবিল, “সীতা কী ভাগ্যবর্তী! আমাকে কেহ যদি এইরূপে হরণ করিত?”

ঝিল্লীমুখরিত নিষুপ্ত রাত্রি। দণ্ডের পর দণ্ড কক্ষে কক্ষে ঘুরিয়া মন্থরা ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছে। কত অমূল্য প্রতিকৃতি এবং চিত্রপট, কত বিচিত্র ভিত্তিচিত্র, শিলা, ধাতু ও দারুমূর্তি সেই রাত্রে রাজপ্রাসাদের চিত্রশালায় ও বিভিন্ন কক্ষে ছিঁড়িয়া পুড়িয়া চূর্ণিত হইয়া গেল কে বলিবে? রাত্রি দ্বিপ্রহরের সময় যখন তাহার করধৃত উল্কা শেষ দীপ্তি দিয়া তৈলাভাবে নিভিয়া গেল তখন মন্থরা সবেমাত্র শ্রীরামচন্দ্রের শয়নকক্ষের মুক্তদ্বারে পা দিয়াছে। তাহার সম্বিৎ ফিরিল; ভাবিল, “যাক, যথেষ্ট হইয়াছে। আর কাজ নাই।” তাহার বাহুদ্বয় শ্রান্ত, দেহ অবসন্ন। ভাবিল, “নাই বা কোথাও গেলাম? বিশৃঙ্খল পুরীতে কে এ-গুলি নষ্ট করিয়াছে তাহার কোনও সাক্ষী নাই, তাহার মতো বৃদ্ধা দাসীকে কেহ সন্দেহ করিবে না। মাথাটা হঠাৎ গরম হইয়া উঠিয়াছিল, মিথ্যা কতকগুলা কুকার্য করিলাম। যাহা হইবার হইয়াছে, এইবার পরশু ধুইয়া মুছিয়া যথাস্থানে রাখিয়া ঘরে ফিরিয়া নিদ্রা দেওয়া যাক।”

মন্থরা ফিরিতে গিয়া সহসা অবাক্ হইয়া দাঁড়াইল। এ কী দেখিতেছে সে? ঘরের মধ্যে রামচন্দ্রের স্বর্ণপর্যঙ্কের পার্শ্বে ক্ষুদ্র একটি স্বর্ণমণ্ডিত সুখাসনে অপরূপ রূপলাবণ্যবতী একজন রমণী উপবিষ্টা! বাতায়নপথে চন্দ্রালোক আসিয়া তাঁহার সর্বাঙ্গে ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করিয়াছিল, তাহার কিরীটে কুণ্ডলে মণিমাণিক্যখচিত বস্ত্রালঙ্কারে ঝলমল করিতেছিল। মন্থরার কিছুক্ষণের জন্য বাক্যস্ফুর্তি হইল না। মুগ্ধবিস্ময়ে বহুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া সহসা সে আত্মস্থা হইল, সাহস সঞ্চয় করিয়া প্রশ্ন করিল, “কে?”

উত্তর নাই। মন্থরা দ্বিতীয়বার কম্পিতকণ্ঠে সসম্ভ্রমে জিজ্ঞাসা করিল, “ভদ্রে, আপনি কে?” রমণী নীরব। তিনি মন্থরার কথা শুনিতে পাইয়াছেন মনে হইল না, নিমেষহীন নেত্রে পূর্ববৎ বাতায়নপথে বাহিরে জ্যোৎস্না প্লাবিত আকাশের দিকে চাহিয়া বসিয়া রহিলেন। মন্থরা এইবার সাহসে ভর করিয়া কক্ষমধ্যে প্রবেশ করিল; কহিল, “দেবী, উত্তর দিন, আপনি কে? কোথা হইতে আসিলেন?” তখনও উত্তর নাই। এইবার মন্থরা আরও অগ্রসর হইয়া একেবারে রমণীর মুখোমুখি দাঁড়াইল। পরক্ষণেই শিহরিয়া পিছাইয়া আসিল, তাহার মুখ হইতে একটা অস্ফুট আর্তনাদ বাহির হইল। এই ভুবনমোহন রূপ মনুষ্যজগতে যে কেবল একজনেরই ছিল, মন্থরার চক্রান্তে রাজনন্দিনী রাজরাণী সে চিরদুঃখিনী হইয়া জীবন কাটাইয়াছে, শেষ পর্যন্ত অসহ্য অপমানে পাতালপ্রবেশ করিয়াছে। সে কি আজ পাপিষ্ঠা মন্থরাকে শাস্তি দিবার জন্য পরলোক হইতে ফিরিয়া আসিয়াছে? কিন্তু মন্থরার তো মরিবার ইচ্ছা নাই, মৃত্যুর পর নরকের যে বিভীষিকা তাহার জন্য অপেক্ষা করিয়া আছে, সে তাহাকে যতদিন সম্ভব ঠেকাইয়া রাখিতে চায়। সীতার তো হাতে অস্ত্র নাই, তিনি কি শূন্য হস্তেই তাহার ঘাড় মটকাইবেন? মন্থরার হাতে পরশু, কিন্তু সে জানিত, বিদেহী আত্মার নিকট মানুষী অস্ত্রশস্ত্র নিরর্থক! সে নিরুপায় হইয়া আবার সাহসে ভর করিল। হস্তধৃত কুঠার এবং নির্বাপিত উল্কা মাটিতে ফেলিয়া বহুকষ্টে নতজানু হইয়া বলিল, “মহাদেবী, জানি আমি আপনার ক্ষমার যোগ্য নহি, তবু আপনাকে আজ আমাকে ক্ষমা করিতে হইবে। আমি পাপিষ্ঠা, কিন্তু আপনি তো মহীয়সী। জীবনে আপনি কখনও কাহারও ক্ষতি করেন নাই, মৃত্যুর পর অসহায়া আশ্রয়প্রার্থিনী আমাকে হত্যা করিলে আপনার সুনামে কলঙ্ক স্পর্শ করিবে।” সীতাদেবী প্রসন্নহাস্যোদ্ভাসিত মুখে পূর্ববৎ অন্যদিকে চাহিয়া বসিয়া রহিলেন, মন্থরার কাতর প্রার্থনা তাঁহার কর্ণগোচর হইয়াছে বলিয়া মনে হইল না। তখন ভয়ে এবং নৈরাশ্যে ব্যাকুলচিত্তা দাসী সবলে তাঁহার স্বর্ণনূপুরশোভিত অলক্তরঞ্জিত পদদ্বয় দুইবাহু বাড়াইয়া জড়াইয়া ধরিল, সঙ্গে সঙ্গে শিহরিয়া ছাড়িয়া দিল এবং পিছাইয়া আসিল। এ কি কঠিন শীতল স্পর্শ! এ তো মনুষ্যদেহের স্পর্শ নয়, অনবদ্যাঙ্গী নবনীতকোমলা সীতাদেবীর দেহে পুষ্পপেলবতার পরিবর্তে এই ধাতব কঠিনতা আসিল কেমন করিয়া? পরক্ষণেই ভয় ভাঙ্গিয়া হাসি পাইল, মন্থরা উন্মত্তের মতো ‘হা, হা’ করিয়া হাসিয়া উঠিল। তাই বলো, স্বর্ণসীতা? কি ভয়টাই না দেখাইয়াছিল মূর্তিটা! নাঃ, এ পাপও আর রাখিয়া কাজ নাই; ইহাই তাহার অদ্য রজনীর শেষ বলি হউক। মন্থরা হাসিতে হাসিতে জ্যোতির্ময়ী স্বর্ণপ্রতিমার মস্তক লক্ষ্য করিয়া পরশু উঠাইল! দয়াময়ী! সতী! না, না, মন্থরার আজ দয়া করিলে চলিবে না। এক দণ্ডে হউক, এক প্রহরে হউক, সারারাত্রি জাগিয়া হউক, এ মূর্তি সে ধ্বংস করিবে। এ পুরীতে সীতার স্মৃতি অসহ্য, তাঁহার অনবদ্য রূপের এই জীবন্ত বিগ্রহ কি করিয়া রাখা চলিতে পারে? ছবিগুলার মুখাগ্নি না করা অপরাধ হইয়া গিয়াছে।

মন্থরার শ্রান্ত দুই বাহুতে সহসা যেন যৌবনের বল ফিরিয়া আসিল। দুই হস্তে পরশু তুলিয়া সে প্রাণপণ বলে স্বর্ণসীতার মস্তকে আঘাত করিতে গেল; কিন্তু সে আঘাত যথাস্থানে পৌঁছিল না। দাসীর শীর্ণ হস্ত কাহার পেশীবহুল সবলহস্তে বাধা পাইয়৷ মধ্যপথে থামিয়া গেল। পশ্চাদ্দেশ হইতে একটা প্রকাণ্ড ছায়ামূর্তি যেন অতর্কিতে তাহাকে আক্রমণ করিয়াছে। এক নিমেষের জন্য তাহার সমস্ত দেহ থর থর করিয়া কাঁপিয়া উঠিল, পরক্ষণেই তাহার শিথিল মুষ্টি হইতে পরশু খসিয়া পড়িল, সেও আতঙ্ক বিহ্বল কণ্ঠে উন্মাদের মতো একটা বিকট চীৎকার করিয়া সংজ্ঞা হারাইল। তাহার হতচেতন দেহ বাতাহত কদলীবৃক্ষবৎ সশব্দে গৃহকুট্টিমে পতিত হইয়া দুই-একবার স্পন্দিত হইল, তারপর ক্রমে স্তব্ধ হইয়া গেল।

সেদিন মধ্যরাত্রে যে ব্যক্তি শ্রীরামচন্দ্রের শয়নকক্ষে মন্থরাকে স্বর্ণসীতার মূর্তি ধ্বংস করিতে বাধা দিল তাহার নাম পূর্বেই বলিয়াছি। প্রধানতঃ স্বর্ণকার বলিয়া পরিচিত হইলেও বিশাখদত্ত ছিল সে-যুগের শ্রেষ্ঠ শিল্পী এবং ভাস্কর, তাহার রচিত বহু অনবদ্য মূর্তি সেদিন অযোধ্যার বহু মন্দিরগাত্রের এবং রাজপথের শোভাবর্ধন করিত; বহু রাজামাত্য, শ্রেষ্ঠী, এবং সামন্ত নৃপতি তাহার রচিত মূর্তি দিয়া নিজ নিজ অট্টালিকা সাজাইতে বিশেষ গর্ব অনুভব করিতেন। বিশাখদত্ত রাজাধিরাজ রামচন্দ্রের বিশেষ স্নেহভাজন ছিল, অন্তঃপুরেও তাহার যাতায়াত ছিল। রামরাজ্যাভিষেকের সময় সীতাদেবীর জন্য বহু বিচিত্র অলঙ্কার সে রচনা করিয়াছিল, সেই সঙ্গে রূপের পূজারী সে, গোপনে তাঁহার একটি সুন্দর পূর্ণাবয়ব সিক্‌থ-প্রতিমা, অর্থাৎ মোমের মূর্তি নিজ অবসর বিনোদনের জন্য রচনা করিতেছিল। সীতানির্বাসনের পর যজ্ঞকার্যের সহায়তার জন্য রামচন্দ্র যখন তাহাকে স্বর্ণসীতা নির্মাণের ভার দিলেন তখন রাজদত্ত স্বর্ণ এবং মণিরত্নাদির দ্বারা সেই সিকৃথ-প্রতিমার সঞ্চের সাহায্যে সে সীতাদেবীর এক অবিকল অপরূপ স্বর্ণময়ী প্রতিকৃতি নির্মাণ করিয়া রামচন্দ্রকে এবং দেশবাসীকে বিস্মিত করিয়াছিল। এক বৎসরের মধ্যে সেই দুঃসাধ্য কর্তব্য পালন করিয়া সে প্রচুর রাজপ্রসাদও লাভ করিয়াছিল। সর্বসাধারণের নিকট সম্মান এবং ধনী ও রাজন্যগণের নিকট প্রতিকৃতিনির্মাণের জন্য নিয়োগ ও অর্থলাভ করিয়া বিশাখদত্ত নিজে আজ নগরীর একজন শ্রেষ্ঠ ধনী এবং মানী ব্যক্তিরূপে পরিগণিত। বহু স্বর্ণকার এবং রূপদক্ষ তাহার কর্মশালায় ছাত্র এবং কর্মিরূপে নিযুক্ত। তবু বিশাখদত্তের মনে সুখ নাই; তাহার সবচেয়ে বড়ো দুঃখ—সীতাপ্রতিমার মতো দ্বিতীয় প্রতিমা সে আজ পর্যন্ত আর নির্মাণ করিতে পারিল না। ঢালাই করিবার সময় তরল স্বর্ণ যখন তাহার মোমের পুতুলটিকে গলাইয়া তাহার স্থানাধিকার করিল তখন বিশাখদত্ত অশ্রুসংবরণ করিতে পারে নাই। যাহারা তাহার স্বর্ণপ্রতিমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হইয়াছিল তাহারা কেহই তাহার নিভৃত কর্মশালার সিক্‌থ-প্রতিমা দেখে নাই। সে লাবণ্য, সে মাধুর্য এবং জীবন্তবৎ ভাব কঠিন ধাতুতে অবিকৃত রাখা সম্ভব নহে। যাহাই হউক, আজ সীতাও নাই, তাঁহার সে সিক্‌থ-প্রতিমূর্তিও নাই, স্বর্ণসীতাই বর্তমানে তাহার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পকীর্তি। সে নিজে তাহার মূল্য যত বুঝিবে, সীতাপতি রামের অবর্তমানে কে আর তত বুঝিবে? বিশাখদত্ত আপনার মনকে বুঝাইয়াছিল, শিল্পের মর্যাদা যে দিতে জানে, কলাবস্তুর উপর তাহার দাবীই সর্বাধিক। এ-ক্ষেত্রে সে নিজে যে প্রতিমার রচয়িতা, সে প্রতিমার প্রকৃত অধিকারী যখন দেহত্যাগ করিয়াছেন তখন তাহা তাহারই অধিকারে ফিরিয়া আসা ন্যায়তঃ ধর্মতঃ যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু মূঢ় দেশবাসী এবং রামের বংশধরগণ তাহার দাবী স্বীকার করিবে বলিয়া তাহার বিশ্বাস ছিল না, তাই আজ নগর ব্যাপী বিশৃঙ্খলার সুযোগে সে তাহার অদ্বিতীয় অতুলনীয় শিল্পসৃষ্টি স্বর্ণসীতাকে হরণ করিতে কৃতসংকল্প হইয়া আসিয়াছিল। রাজান্তঃপুরের প্রাসাদ প্রাঙ্গণে সোপানশ্রেণীর ঊর্ধ্বে স্তম্ভান্তরালে তাহার বিশেষ বিশ্বস্ত চারিজন ক্রীতদাস একটি শিবিকা লইয়া অপেক্ষা করিতেছিল, সে নিজে একটি কৃষ্ণবর্ণ উত্তরীয়ে দেহ এবং অনুরূপ আর একটি ক্ষুদ্র বস্ত্রখণ্ডের দ্বারা মুখ এবং নাসিকা আবৃত করিয়া ত্রিতলে আরোহণ করিয়াছিল। একটি পূর্ণাবয়ব-মনুষ্যদেহ-ধারণে-সক্ষম-মহিষচর্মনির্মিত-দৃতি এবং বস্ত্রখণ্ড তাহার পৃষ্ঠদেশে বিলম্বিত, কটিবন্ধে কোষবদ্ধ ছুরিকা, হস্তে প্রয়োজনমত অগ্নি প্রজ্বালনের জন্য অরণিপ্রস্তর। মধ্যরাত্রে সতর্ক পদক্ষেপে রামচন্দ্রের শয়নকক্ষে প্রবেশ করিয়া বিশাখদত্ত সহসা সেখানে মন্থরাকে দেখিয়া প্রথমে ভয় পাইয়া গিয়াছিল, পরক্ষণেই তাহার দুরভিসন্ধি বুঝিতে পারিয়া তাহাকে বাধা দেয়। দ্রুতবেগে পশ্চাদ্দেশ হইতে আসিয়া সে দৃঢ়মুষ্টিতে কুব্জার দুই হস্ত ধরিয়া ফেলায় সীতাদেবীর স্বর্ণপ্রতিমা সে-যাত্রা রক্ষা পাইল।

মন্থরাকে চিনিতে বিশাখদত্তের ভুল হয় নাই, সে রূপ দূর হইতে একবার দেখিলে কাহারও পক্ষে জীবনে বিস্মৃত হওয়া কঠিন। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় তাহার অতর্কিত আবির্ভাব শিল্পীকে বড়োই বিপদে ফেলিল, তাহার সমস্ত পূর্ব পরিকল্পনা বিপর্যন্ত করিয়া দিল। সে কিছুক্ষণ কান পাতিয়া শুনিল, মন্থরার আর্তনাদে এবং পতনশব্দে আকৃষ্ট হইয়া পুরবাসী কেহ আসে কি না। বহুক্ষণ পর্যন্ত সে সভয়ে পর্যঙ্ক-পাদদেশে আত্মগোপন করিয়া বসিয়া রহিল, কয়েকপল অতিক্রান্ত হইলেও যখন কেহ আসিল না তখন ধীরে ধীরে নিকটে আসিয়া মন্থরার মণিবন্ধ দক্ষিণ হস্তে ধরিয়া তাহার নাড়ীর গতি অনুভব করিল। যখন তাহার প্রত্যয় হইল যে কুব্জা মরে নাই তখন তাহার সাহস এবং বুদ্ধি ফিরিয়া আসিল, সে নিজের মুখাবরণ খুলিয়া মন্থরার মুখ দৃঢ়রূপে বাঁধিল, সঙ্গে আনীত রজ্জু-দ্বারা তাহার হস্তপদ বাঁধিল, তারপর তাহার সংজ্ঞাহীন দেহটা স্বর্ণপর্যঙ্কের তলদেশে ঠেলিয়া দিয়া শয্যায় আস্তৃত দুগ্ধশুভ্র কৌষের আস্তরণখানি আভূমি বিলম্বিত করিয়া দিল। অতঃপর ক্ষিপ্রহস্তে সীতাদেবীর শূন্যগর্ভ স্বর্ণপ্রতিমাখানিকে সুখাসন হইতে নামাইয়া গৃহকুট্টিমে শায়িত করিয়া ফেলিয়া সে সেটিকে মহিষদৃতির মধ্যে প্রবিষ্ট করাইয়া দৃতির মুখ বাঁধিয়া ফেলিল। তারপর সন্তর্পণে চারিদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতে করিতে সে কক্ষ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া দাসদিগকে ডাকিতে গেল।

কক্ষদ্বারের বহির্দেশে অলিন্দপথে দাঁড়াইয়া এক ব্যক্তি এতক্ষণ নিঃশব্দে মন্থরা ও বিশাখদত্তের কার্যকলাপ লক্ষ্য করিতেছিলেন, তিনি অন্ধকারে দ্বারপ্রান্তে সরিয়া দাঁড়ানোয় শিল্পীর সঙ্গে তাঁহার অঙ্গসংঘর্ষ ঘটে নাই। বিশাখদত্ত বাহির হইবার সঙ্গে সঙ্গে তিনি দ্রুতপদে কক্ষে প্রবেশ করিয়া দ্রুত হস্তে দৃতিমুখের বন্ধন খুলিয়া সীতা-প্রতিমাটিকে টানিয়া বাহির করিলেন। এক নিমেষের জন্য চন্দ্র-কিরণোদ্ভাসিত স্বর্ণসীতার মুখের দিকে চাহিয়া তিনি উদ্‌গত অশ্রু রোধ করিলেন, একবার নতজানু হইয়া তাহাকে প্রণাম করিলেন। তারপর শয্যা প্রান্তে বিলম্বিত আস্তরণ ঈষৎ উত্তোলন পূর্বক পর্যঙ্কতলশায়িনী হতচেতনা মন্থরার পদদ্বয় ধরিয়া তাহাকে হিড়হিড় করিয়া টানিয়া বাহির করিলেন এবং সেইস্থানে স্বর্ণসীতাকে সযত্নে স্থাপন করিলেন। সীতা-প্রতিমা শয্যাস্তরণের অন্তরালে সম্পূর্ণরূপে অন্তর্হিত হইলে তিনি মন্থরাকে মহিষদৃতির মধ্যে ভরিয়া দৃতির মুখবন্ধন করিতে করিতেই কক্ষ বহির্দেশে কয়েক ব্যক্তির মৃদু পদশব্দ শুনিতে পাইলেন। উপায়ান্তর না দেখিয়া তিনি নিজেও নিমেষমধ্যে সেই সুপ্রশস্ত পর্যঙ্ক তলদেশে আত্মগোপন করিলেন।

বিশাখদত্ত সানুচর কক্ষে প্রবেশ করিল। তাহার সঙ্গে ছিল চারজন কৃষ্ণবস্ত্রাচ্ছাদিত বাহকের দ্বারা বাহিত একটি ময়ূরপঙ্খী নৌকাকৃতি বহুমূল্য রজতময়ী শিবিকা। শিবিকাভান্তরে একজন আরোহী স্বচ্ছন্দে শয়ন করিয়া বা উপবেশন করিয়া যাইতে পারে। দুইটি স্বর্ণমকরমুখমণ্ডিত রৌপ্যদণ্ড শিবিকার দুইদিকে সংলগ্ন ছিল। বাহকেরা বিশাখদত্তের ইঙ্গিতে শিবিকা নামাইয়া দৃতিমধ্যস্থা মন্থরাকে সকলে মিলিয়া ধরাধরি করিয়া উঠাইয়া উহার মধ্যে প্রবিষ্ট করাইতে সচেষ্ট হইল। এমন সময় বাহিরে কিসের যেন শব্দ শ্রবণগোচর হওয়ায় বিশাখদত্ত চকিত হইয়া উঠিল। বলিল, “তোমরা শীঘ্র আমাকে অনুসরণ কর, আমি পথ পরিষ্কার আছে কি না দেখিতেছি।” সে চলিয়া যাইবার পরমুহূর্তেই ভৃত্যেরা মন্থরাকে শিবিকাভ্যন্তরে স্থাপন করিয়া উহার চতুর্দিকে ক্ষৌমবস্ত্রাবরণ ঝুলাইয়া দিল। দুইদিকের দণ্ডে স্কন্ধসংযোগপূর্বক শিবিকাটি উত্তোলন করিয়া অতঃপর তাহারা ধীরপদে কক্ষত্যাগ করিল। হতভাগিনী মন্থরার অপহৃতা হইবার বড়োই সাধ ছিল, কিন্তু নিয়তির চক্রান্তে সেই দুর্লভ সুযোগ যখন তাহার জীবনে আসিল তখন তাহার মাধুর্য সজ্ঞানে উপভোগ করিবার সামর্থ্য তাহার ছিল না, যাহারা তাহাকে হরণ করিল, তাহারাও জানিল না কোন নারীরত্ন তাহারা হরণ করিয়া লইয়া চলিল, এইরূপ নিষ্কাম নারীহরণের জন্য কী শাস্তি তাহাদের অদৃষ্টে অপেক্ষা করিতেছে!

সোপানশ্রেণী অতিক্রম করিয়া বাহকগণ বিশাখদত্তকে অনুসরণপূর্বক প্রাসাদান্তঃপুরের প্রাচীরবেষ্টিত বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণে নামিল। উহা অতিক্রম করিয়া দক্ষিণ দ্বারে উপস্থিত হইতেই বিশাখদত্ত কপাট উন্মোচন করিয়া দাঁড়াইল। তাহারা শিবিকাসহ আর কয়েকটি সোপান অবতরণ করিরা একটি ক্ষুদ্রপথে গিয়া পড়িল। ঐ পথ অদূরে রাজপথে গিয়া মিলিয়াছিল। বাহকেরা দৃষ্টিপথের অন্তরালবর্তী না হওয়া পর্যন্ত বিশাখদত্ত নির্নিমেষনেত্রে তাহাদের দিকে চাহিয়া রহিল, তাহার পর নৈশ্চিন্ত্যের নিঃশ্বাস ফেলিয়া দ্বার রুদ্ধ করিয়া পশ্চাতে ফিরিতেই দেখিল, একজন দীর্ঘকায় সৈনিকপুরুষ তাহার পশ্চাতে দণ্ডায়মান। স্বীয় উষ্ণীষাগ্রভাগ দ্বারা তাঁহার মুখের নিম্নভাগ আবৃত, তাঁহার হস্তে উন্মুক্ত তরবারি। তিনি কোনও কথা কহিলেন না, নিঃশব্দে বিশাখদত্তের নিশ্চল দেহের পশ্চাতে গিয়া দাঁড়াইলেন, নিজ উলঙ্গ কৃপাণশীর্ষ তাহার পৃষ্ঠদেশে সংলগ্ন করিয়া তাহাকে অঙ্গুলিসঙ্কেতে অগ্রসর হইতে বলিলেন। ভয়বিহ্বল শিল্পীর মুখে বাক্যস্ফূর্তি হইল না, সে সৈনিকের নির্দেশে যন্ত্রচালিতের মতো আবার সেই প্রাঙ্গণ পার হইয়া সোপান-পাদদেশে আসিল। বিস্তৃত সোপানশ্রেণীর দক্ষিণপার্শ্বে একটি ক্ষুদ্র গুপ্তদ্বার ছিল, সেখান হইতে আর একটি সঙ্কীর্ণ সোপানশ্রেণী ভূগর্ভে কারাগারে নামিয়া গিয়াছিল। অন্তঃপুরিকারা কেহ কোনও গুরুতর অপরাধ করিলে প্রাচীনকালে সেই ভূগর্ভস্থ বন্দীশালায় বন্দিনী থাকিত। রামচন্দ্রের সময়ে দীর্ঘকাল সেই সোপান বা কক্ষ ব্যবহৃত হয় নাই; দ্বার খুলিবামাত্র নিশাচর পক্ষীর পক্ষ-বিধুনন শব্দ শ্রুতিগোচর হইল, অজিনপত্রার দুর্গন্ধে শিল্পীর বমনোদ্রেক হইল। বিশাখদত্ত সেই সোপানপথে কিয়দ্দূর অবতরণ করিতেই তাহার মাথার উপর লৌহদ্বার সশব্দে রুদ্ধ হইয়া গেল। নিস্তব্ধ প্রাসাদে সেই শব্দের প্রতিধ্বনি মিলাইতে না মিলাইতে অকস্মাৎ নিদ্রাভঙ্গে বিরক্ত সারস-ময়ূর-কোকিলাদি কয়েকটা গৃহপালিত পক্ষী একবার কোলাহল করিয়া উঠিল, প্রাসাদ-বহির্দেশস্থ পথে কয়েকটা সারমেয় তাহাদের ঐকতানে যোগ দিল। অমাত্য ভদ্র প্রস্তরমূর্তির মতো দাঁড়াইয়া রহিলেন। তখনও পুরবাসী জাগিল না, কেহ সন্ধান লইতে আসিল না। কোলাহল নীরব হইলে ভদ্র ত্রিতলে উঠিয়া গেলেন, স্বর্ণসীতাকে যথাস্থানে রাখিয়া নামিয়া আসিলেন এবং প্রাসাদতোরণে গিয়া তরবারি হস্তে প্রহরায় নিযুক্ত রহিলেন।